

Buy প্রথম আলো (অখণ্ড) Online in Bangladesh
লেখক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (নীললোহিত)
- Author: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (নীললোহিত)
- Publisher: আনন্দ পাবলিশার্স (ভারত)
- Isbn: 9788177568295
- Number Of Pages: 1135
- Language: বাংলা
- Edition: 1st Edition, 2010
পণ্য সারসংক্ষেপ (Summary)
‘প্রথম আলো (অখণ্ড), বইটির ফ্ল্যাপ তির সামনে ছুটে যাওয়ার আগে কিছুটা পিছিয়ে যায়। ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে যে-কোনও সমাজের মাঝেমাঝে ঐতিহ্য ও ইতিহাসের দিকে পিছু ফিরে দেখা দরকার। আমাদের দেশের অনতি-অতীতের পুনর্দর্শন ও পুনর্বিচার নিয়েই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বর্ণাঢ্য, বেগবান উপন্যাস ‘প্রথম আলো’। উপন্যাসটিপতে আছেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, জগদীমচন্দ্র বসু, ভগিনী নিবেদিতা, অবনীন্দ্রনাথ, গিরিশিচন্দ্র ঘোষ, অর্ধেন্দু মুস্তাফীর তমো খ্যাতনামা সব ঐতিহাসিক চরিত্র। তা সত্ত্বেও ‘প্রথম আলো’র মূল নায়ক- সময়। আঠারোশো তিরাশি থেকে উনিশশো সাত পর্যন্ত যে-সময়কাল বিস্তৃত। যখন হঠাৎ যেন ঘুম ভেঙে নবজাগরিত কিছু মানুষ আবিষ্কার করছে দেশ নামের এক ভাবসত্তাকে, অনুভব করছে পরাধীনতার গ্লানি। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের ধর্ম আন্দোলন, মহেন্দ্রলাল সরকারদের বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারা, পেশাদারি রঙ্গমঞ্চ ও প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের ভূমিকা, রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের নানা রূপান্তর, কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে নবীনদের মতবিরোধ, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সূচনা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদরেখা সৃষ্টি ইত্যাদি ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ অনুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে ‘প্রথম আলো’ উপন্যাসে। মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি ও বিশালতা নিয়ে এই উপন্যাসে কাহিনি পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ছড়িয়ে পড়েছে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায়, তারপর সমগ্র ভারতে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ‘প্রথম আলো’ পাঠকচিত্ত জয় করেছে কবেই, কালজয়ের সামর্থ্যেও সে বলীয়ান।সূচীপত্রমুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় ঐক্যস্বৈরাচার থেকে আমরা এখন কতদূরেগণতন্ত্রের কাপালিক উপাসক এবং আমরাযে সাধনা সত্য হবার নয়, প্রিয় হবারইতিহাস বিকৃতকারীরা ৭ই জুন থেকে শিক্ষা নিনগণতন্ত্রের নাস্তি আরাধনাবাংলাদেশের বাঙালীর অভিজ্ঞান সংকটযেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামহীন গোত্রহীনধর্মের রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদসমাজ বিকাশের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্যবঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হয়েছিলরবীন্দ্রনাথ, না-রবীন্দ্রনাথ ধারার প্রকৃতিসিপিবি’র বিভক্তির উৎস সন্ধানেমত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমার সন্ধানেইতিহাসের সঙ্গে কানামাছি খেলার খেসারতইতিহাসের নব ধারাপাত কতটা ধারাবাহিকবাঙালী জাতীয়তাবাদ ও বাংলা সংস্কৃতিআসিছে অন্ধ স্বদেশ দেবতা ফাঁসীর মঞ্চ অনুসরিএদের চিনতে যেন ভুল না করিইতিহাস চর্চার মানসিক উপাদানআদর্শমুক্ত রাজনীতিছদ্মবেশী-একনায়কত্বের অবসান
রিভিউ ও রেটিং (Review & Rating)

বাজারে অনেক ফাঁকে Edition আছে কিন্তু সব দিক থেকে অরিজিনাল টায় বেস্ট. binding quality is really good. the fonts are clear.

অতি ক্ষুদ্র ফন্ট!! এবং চিকন!! তারপরও ১১৩৫ পেজ। ফন্ট ছোট না করে উপায়ও নেই!!
#সপ্তর্ষি_রকমারি_বুকরিভিউ_প্রতিযোগ নামঃনিরুপম কুন্ডু জেলাঃপাবনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঃপাবনা জেলা স্কুল ই-মেইলঃ parbon5@gmail.com --- বইয়ের নামঃপ্রথম আলো(অখন্ড) লেখকঃসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়(নীললোহিত) প্রকাশনীঃআনন্দ পাবলিশার্স পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ১১৩৫ ধরণঃঐতিহাসিক উপন্যাস লেখক পরিচিতিঃ ------------- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মাদারীপুরে জন্মগ্রহণ করেন।মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৫৩ সাল থেকে তিনি কৃত্তিবাস নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ এবং ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম উপন্যাস 'আত্মপ্রকাশ'প্রকাশিত হয়। শিশুসাহিত্যে তিনি "কাকাবাবু-সন্তু" নামে এক জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজের রচয়িতা। ২৩ অক্টোবর ২০১২ এই মহান লেখক মৃত্যুবরণ করেন। প্রারম্ভঃ ----- "হেথা হতে যাও,পুরাতন! হেথায় নুতন খেলা আরম্ভ হয়েছে।" [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের'কড়ি ও কোমল'থেকে,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের'প্রথম আলো'উপন্যাসেও উল্লিখিত] বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বাণীটি আপাতদৃষ্টিতে অমোঘ প্রতীয়মান হলেও অন্তত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত প্রথম আলো উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটি সঠিক নয়।কেন? ইতিহাসের বই আর সাহিত্যের বইয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য হল,প্রথমটায় সাহিত্যরস প্রায় থাকে না কিন্তু তথ্য থাকে প্রচুর,আর দ্বিতীয়টায় তথ্য প্রায় থাকে না কিন্তু সাহিত্যরস থাকে যথেষ্ট।আবার জানার আগ্রহে ইতিহাস পড়ে কিছু সাল-তারিখ আর ঘটনা জানলেও তৎকালীন সমাজের রুপ,রস,গন্ধ,মানুষের ভাবনা,চিন্তা,চেতনা অনুভব করা যায় খুব কমই।কিন্তু যদি এক বইতেই সাহিত্যরস,ইতিহাস আর সেকালের সব কিছুই মেলে,তাহলে কেমন হয়?প্রথম আলো এমনই একটি উপন্যাস,যা আপনাকে নিয়ে যাবে এই উপমহাদেশের বিগত এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে।এই আখ্যান সময়ের গল্প বলে,জানায় পালাবদলের কবিতা,গায় মানবতার আর ভালোবাসার গান।মানবমনের দর্পণ হলো সাহিত্য,এই কথা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ হয় এই বইটিতে।একে পুরাতন বলে উপেক্ষা করা যায় না কিছুতেই।তাই,১১৩৫ পৃষ্ঠার এই সুবিশাল বইটি আমার অত্যন্ত প্রিয়। প্রচ্ছদঃ ----- লাল হলুদ রঙের পটভূমিতে প্রথমেই চোখে পরে তরুণ রবীন্দ্রনাথকে।তার বাম পাশে পেছনে রয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ,আর তার পেছনে একটু উপরে রয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ।বইয়ের কাহিনীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। চরিত্রপরিচিতি: ----------- ঐতিহাসিক বই যখন আমি পড়ি,তখন আমার মনে একধরণের রোমাঞ্চ অনুভব হয়।আমি যেন একটা গন্ধ পাই,আমার চোখের সামনে যেন কোনো বিশেষ রঙ খেলা করে।এই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়জনিত ব্যাপারটার হদিশ প্রথম পাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলো বই টি পড়ে,এতে কোনো সন্দেহ নেই।খুব ছোটবেলায় প্রথম বার পড়ে অবশ্য বই টি বুঝতে পারিনি।আরেকটু বড় হয়ে যখন বইটি হাতে নিলাম,আমার সামনে যেন আরেকটা বিশ্ব উন্মোচিত হলো।যে অপার্থিব জগতের সময় সদৃশ গগনে উজ্জ্বল নক্ষত্ররূপে খচিত রয়েছেন এই উপমহাদেশের ১৯ ও ২০ শতকের রথী-মহারথীগণ,যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার(বিশেষত রবিঠাকুরের নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবী,দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর),জ্ঞাননদানন্দনী,স্বর্ণকুমারী দেবী,ইন্দিরা দেবী,প্রমথ চৌধুরী,সরলা ঘোষাল,বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,রাজা বীরচন্দ্র মাণীক্য ও তার পুত্র রাধাকিশোর মাণিক্য,নাট্যভিনেতা গিরীশচন্দ্র ঘোষ ,নটী বিনোদিনী,অর্ধেন্দুশেখর,ডা মহেন্দ্রলাল সরকার,কাদম্বিনী দেবী,আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু,শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব,তার সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ,সিস্টার নিবেদিতা,ক্ষুদিরাম, প্রায় অচেনা গান্ধিজী,গোখলে, তিলক, হেম,সত্যেন,অরবিন্দ ঘোষ,বারীন প্রমুখ।ঘটনার ঘনঘটায় উঠে এসেছে আরও নানা চরিত্র,নানা আখ্যান।তবে পুরো উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ভরত ও ভূমিসূতা নামের দুটি কাল্পনিক চরিত্রকে ঘিরে।ভূমিসূতাকে পাওয়ার আকাঙ্খায় ভরতের সাথে লেখক যেন পাঠককূলকে ঘুড়িয়ে আনলেন পুরো ভারতবর্ষে,১৮৮৩ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত এই উপমহাদেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ ২৪ বছর সময়জুড়ে। কাহিনী সংক্ষেপঃ -------------- পরাধীনতার অমানিশা ভেদ করে প্রথম স্বাধীনতার আলোকচ্ছটার স্পর্শের এই কাহিনী শুরু হয় ১৮৮৩ সালের তৎকালীন বাংলার একমাত্র স্বাধীন রাজ্য ত্রিপুরার রাজপরিবারে বিজয়া দশমীর হাসাম ভোজের মধ্য দিয়ে।রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য,যিনি চন্দ্রবংশীয় স্বাধীন রাজা,ফটোগ্রাফি এবং বাংলা ভাষার কবিতা ও গানের বিশেষ অনুরাগী।রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীন ষড়যন্ত্র,ঘটনার ঘনঘটায় ভরত ও শশীভূষণের পরিচয়,বীরচন্দ্র মাণিক্যের শ্যেনদৃষ্টিতে পরা ও ভরতের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের সূত্রপাত-সবকিছুকে কেন্দ্র করে কাহিনী এগোতে থাকে।লেখক এই কাহিনীর সমান্তরালভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তৎকালীন কলকাতার কাহিনীকেও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। দুই কাহিনীর যোগসূত্র রচিত হয় পাটরাণীকে হারিয়ে ভগ্নহৃদয় রাজার রবিঠাকুরের কাব্য পড়ে সান্তনা পাওয়ার উপহারস্বরূপ তাঁকে শাল-দোশালা পাঠানোর মধ্য দিয়ে।ধীরে ধীরে উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবীর মধুর সম্পর্ক,আবির্ভাব হয় রবীন্দ্রনাথের দাদা,প্রচন্ড ব্যক্তিত্যশালী ও উচ্চাকাঙ্খী পুরুষ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের।প্রথমবার স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর বেদনাদায়ক মৃত্যু আর দ্বিতীয়বার কাহিনীর অনেক পড়ে ইংরেজদের সাথে জাহাজ ব্যবসায়ের প্রতিযোগিতায় নেমে সর্বস্বান্ত হওয়ার পর উপন্যাস থেকে বিদায় ঘটে তার। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটক রচনা ও পরিচালনার মধ্য দিয়ে কাহিনীর নতুন এক শাখা রচিত হয়,যা বাংলা নাটকের স্বর্ণযুগ উন্মোচন করে।আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট কবি থেকে বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ হয়ে ওঠার কাহিনীর পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবন পুরো উপন্যাসজুড়েই পাঠককূলকে মোহাবিষ্ট করে রাখে।এছাড়াও ঠাকুর পরিবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত স্বর্ণকুমারী দেবী,ইন্দিরা দেবী ও সরলা ঘোষাল প্রমূখের সাথে বা কংগ্রেস গঠন ও কংগ্রেসের অভ্যন্তরীন গোলযোগ এবং পরিশেষে স্বাধীন ভারতের দিকে ধাবমান হওয়ার দিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের সাথেও পাঠক পরিচিত হয়। ভরত ও শশীভূষণের আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের আরেকটি প্রধাণ শাখা- তৎকালীন হিন্দুধর্মের সাধারণ মানুষের সঠিক পথ সম্পর্কে বিভ্রান্তি,কেশব সেনের ব্রাহ্ম আন্দোলন ও পরবর্তীতে ভক্তিবাদের উত্তরণ ঘটার দিকটি ফুটে ওঠে।এর সাথে দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরের পুরোহিত শ্রীরামকৃষ্ণ ও তার শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের সাথে পাঠকের পরিচয় ঘটে।পুরো উপন্যাসে এই দুই ব্যক্তি স্বমহিমায় বিরাজ করেন।শশীভূষণের অসুস্থতার সময় লেখক পরিচয় করিয়ে দেন ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের সাথে,যার বিজ্ঞানমনষ্ক চিন্তার সাথে পাঠকের পুরো উপন্যাসেই দেখা হবে।তাঁর মাধ্যমে আমরা পরিচিত হই আচার্য জগদীশ চন্দ্র ও এদেশের প্রথম মহিলা ডাঃ কাদম্বিনী দেবীর সাথে।এভাবে কাহিনী চলতে থাকে,তার সাথে চলতে থাকে ভূমিসুতার প্রতি ভরতের প্রেম ও তাদের বিরহগাথা।বাঙালি জাতির তাৎপর্যপূর্ণ এই যুগসন্ধিক্ষণ কে উপজীব্য করে এমন কালাশ্রিত উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে অন্তত আর রচিত হয়নি। পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ ------------ প্রথমেই বলে রাখি,ব্যাপ্তিতে ও বৈচিত্র্যে বিশাল এই উপন্যাসটির রিভিউ দেয়া আমার জন্য দুঃসাধ্য।তারপরও যতটুকু পারা যায় চেষ্টা করছি।এককথায় বলতে গেলে,প্রায় ১২৬ বছরের বৃটিশ শাসনের পর বাংলা ও বাঙালীর মনোভাব,তাদের উপলব্ধি, সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হবার পর এক শ্রেণীর মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্নের বিসর্জন ও অপরদিকে এক নতুন চেতনা,এক নবজাগরণে ভাস্বর এক বিশেষ শ্রেণীর উত্তরণ-এটিই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।এটি প্রধাণত ইতিহাস নির্ভর কল্পনাশ্রিত উপন্যাস,যার নায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয় স্বয়ং সময়কে।জাতি হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কালের নিয়মে নিজেদের অজান্তেই আত্মন্নয়নে নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধিকা প্রতিষ্ঠার পূর্বপ্রস্তুতিকাল হিসেবে গণ্য করা যায় এই সময়কে।দীর্ঘসময় ইটের নিচে চাপা পড়ে সাদা হয়ে থাকা ঘাস হঠাৎ সূর্যের আলোর স্পর্শ পেয়ে যেমন প্রাণপণে সজীব হতে চায়,তেমনই অশিক্ষা ও কুসংস্কারের ঠুলি পরানো, ইংরেজ শাসনের রূপোর কাঠির স্পর্শে গহন নিদ্রায় নিদ্রিত বাঙালি জাতি হঠাৎ যেন জেগে উঠছে ভাগ্যদেবীর আশীর্বাদপুষ্ট বঙ্গের কিছু ইতিহাসের বরপুত্রগণের হাত ধরে।পরাধীন অন্ধকারাচ্ছন্ন ভারতবর্ষের মাঝে বঙ্গের একটুকরো অংশ যেন হয়ে ওঠে আলোর সুতিকাগার।শিল্প-সাহিত্যে,চলনে-মননে প্রভূত উৎকর্ষতায় সকলের অজান্তেই এই অঞ্চলের বাংলাভাষী সম্প্রদায় যেন এক হতে থাকে,যার আভাস পাওয়া যায় বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের সময়।স্বাধীনতার প্রচ্ছন্ন আলো যেন কিছু মানুষকে আলোকিত করতে শুরু করে।এই দিক দিয়ে বইটির নামকরণ যথার্থ।প্রথম আলো পড়ার মাধ্যমে যেন আমি এই পুরো ইতিহাসকে নিজের চর্মচক্ষে দেখাই শুধু নয়,অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পেরেছি।এই আনন্দ লিখে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই। ভালো লাগাঃ ---------- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ও ইতিহাসের চরিত্র নিয়ে রচিত হলেও বর্ণাঢ্য এই উপন্যাসে নেই সাল তারিখের অহেতুক বাড়াবাড়ি।উপন্যাসে বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহের সত্যতা পাঠকের কাছে তুলে ধরতে লেখক বইয়ের শেষে তথ্যসূত্র যোগ করেছেন,যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।অতি কৌতুহলী পাঠকগণের কাছেও জ্ঞানার্জনের জন্য এই অংশটি অত্যন্ত উপাদেয়।উপন্যাসের চুম্বক অংশের মধ্যে রয়েছে ত্রিপুরার পাটরাণী ও কাদম্বরী দেবীর একই রকম বেদনাদায়ক মৃত্যু,রবিঠাকুরকে তরুণ কবি থেকে শুরু করে পিতা ও স্বামী হিসেবে,বিশেষ করে কাদম্বরী দেবীর রবি হিসেবে নতুন করে চেনা,বিনোদিনীর আত্মত্যাগ,বাংলার নাট্যজগতের উত্থান,বিজ্ঞানচর্চায় ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার ও জগদীশচন্দ্র বসুর অসামান্য অবদান,প্রায় নাস্তিক নরেন্দ্রনাথের শ্রীরামকৃষ্ণের সাহচর্যে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা ও শিকাগো ধর্মসম্মেলনে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা,বঙ্গভঙ্গের সময় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার এক হয়ে যাওয়া,সরলা ঘোষাল,স্বর্ণকুমারী দেবী প্রমুখের মাধ্যমে অন্তঃপুরবাসিনী নারীর প্রাণহীন দুর্ভেদ্য পাষাণপুরী থেকে বের হয়ে বর্ণিল আলোকিত জগতে পদার্পণ,লর্ড কার্জনের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার নোংরা রাজনীতি প্রভৃতি।তবে এসব ঘটনার মধ্যেও পাঠকের মন পড়ে থাকে অতি সাধারণ দুই যুবক যুবতীর প্রতি,যারা কালস্রোতে ভেসে,ভাগ্যদেবীর পরিহাসে মৃত্যুদ্বার থেকে ফিরে একে অপরের খোঁজে পথে পথে ছুটে বেড়ায় প্রতিটি ক্ষণে।নিজের অজান্তেই তাদের সাথে পাঠক হয়ে যায় একাত্ম।তাদের মিলন কামনায় ও লেখকের লেখনী দক্ষতায় পাঠকের উপন্যাসটি শেষ না করে কোনো উপায় থাকে না।ভরত ও ভূমিসুতার মাধ্যমে প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনার মধ্যে লেখক সুনিপুণ দক্ষতার সাথে রচনা করেছেন অনির্বচনীয়,মনোমুগ্ধকর এক ইন্দ্রজাল। আক্ষেপঃ ------- সুধাকরও নিষ্কলঙ্ক নয়।তবে এই উপন্যাসের তুলনায় তার খুঁতও অধিক বলেই প্রতীয়মান হয়।মহাকাব্যিক আকার ছাড়াও স্বামী বিবেকানন্দের পাশ্চাত্য ভ্রমণসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্ণনা একটু দীর্ঘ মনে হয়েছে।কিছু চরিত্রের বা ঘটনার পরিণতি লেখক উল্লেখ করে যাননি।বিশেষত স্বাধীনতা আন্দোলন বিষয়ে আরেকটু লিখলে ভালো হত।আবার কিছু সংক্ষেপণ করে বঙ্গভঙ্গ রদ সহ স্বাধীন ভারতের অভ্যুদয় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলেও এটি সর্বকালের অন্যতম সেরা বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পেত,আমি নিশ্চিত।কয়েকটি স্থানে সম্বোধনের ক্ষেত্রে লেখক বর্তমানে মানহানীকর এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন।তবে আমার মনে হয়,এবং লেখকেরও বক্তব্য, এটি কোনো সমস্যা নয়।সেই সময়ে এই সম্বোধনগুলো স্বাভাবিক হিসেবেই ধরা হতো।তবে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি মনে হয়েছে,এই ঐতিহাসিক উপন্যাসে অনেক চরিত্র,পার্শ্বচরিত্র থাকলেও সকলেই সমাজের উচ্চবিত্ত অথবা মধ্যবিত্ত।নিম্নবিত্ত কেউ নেই।ইতিহাস শুধু বিত্তশালীদের জাঁকজমক নিয়ে গঠিত নয়,তাদের আড়ালে থাকা ক্ষুধিত পাষাণের ন্যায় দেশের সিংহভাগ নিরক্ষর,হতদরিদ্র মানুষেরাও ইতিহাসের অংশ,ঠিক যেমন প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার।ভরত বা অন্য কাউকেই ঠিক এই শ্রেণীর অন্তর্গত করা যায় না।নামের সাথে মিল রাখার জন্য লেখক হয়ত ইচ্ছা করেই শুধুমাত্র নবজাগরণের আলো প্রথম যাদের স্পর্শ করেছেন,তাদের উল্লেখ করেছেন।সাধারণ মানুষ অবশ্যই তখনো এই স্বর্গীয় অনুভূতি থেকে বঞ্চিত।কিন্তু তবুও অন্তত একটি চরিত্রকে লেখক সেই শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করলে এটি একটি পরিপূর্ণ ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি হতে পারত। প্রিয় অংশঃ --------- “কোকিল,নির্দয় কোকিল,সে খালি ডেকেই চলে।বসন্ত শেষ হয়ে গেছে,তবু সে ডাকে।” “এই প্রথম এক উচ্ছ্বোসিত জলপ্রপাতের মতন কান্নায় আন্দোলিত হলেন কাদম্বরী।আর্তস্বরে বলতে লাগলেন,রবি,রবি,আমি চলে যাচ্ছি।তোমার কবিতা,তোমার গানই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।তোমার রচনার মধ্যেই আমি নিজেকে খুঁজে পেয়ে ধন্য হয়েছি।রবি,আমি চলে যাচ্ছি,নতুন বউঠান এখন পুরাতন হয়ে গেছে,সেই পুরাতন আজ বিদায় নিচ্ছে…” সমাপনঃ ------- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন,উপন্যাস উপন্যাসই,তা কখনো ইতিহাস নয়।কথাটা সত্য।প্রথম আলো ইতিহাসের চাইতেও মহান,ইতিহাসের চাইতেও হৃদয়স্পর্শী।এখানে উল্লেখ্য,এই উপন্যাসটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে First Light নামে অনুদিত রয়েছে।আরেকটি বিশেষত্ব হলো,এই উপন্যাসেই বাংলা সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।এখানে একটি তথ্য জানিয়ে রাখি,‘প্রথম আলো’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘সময়’ ট্রিলজীর বা ত্রিপর্বীয় ঐতিহাসিক উপন্যাসত্রয়ীর ২য় টি,যার প্রথমটি হলো ‘সেই সময়’ ও শেষেরটি হলো ‘পূর্ব-পশ্চিম’। ধুলিধূসর আবছায়া ইতিহাসের কিংবদন্তীগণের সাথে আলিঙ্গন করানো থেকে শুরু করে বাঙালীর নবযুগের নবীণপ্রভাতের জবাকুসুমসঙ্কাশং রবির আলোতে উদ্ভাসিত,ইতিহাসের আলোছায়াময়,জন্মমৃত্যু ও আশানিরাশার এক অনিন্দ্যসুন্দর,অবশ্যপাঠ্য ও সুখপাঠ্য এক উপাখ্যান এই কালজয়ী মাস্টারপিস “প্রথম আলো”।এর সাথে এটি একজোড়া দুর্ভাগা দুর্ভাগিনীর অতিসাধারণ,মিঠে এক প্রেম আর বিরহের বিষব্যথার নিতান্তই এক ‘গল্পগাঁথা’।শেষ পর্যন্ত কী তাদের মিলন হবে?জানতে হলে করতে হবে এই অমৃত আস্বাদন,পড়তে হবে ‘প্রথম আলো’। ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৯/১০ ------------- ছবিঃ সংগৃহীত। ©নিরুপম কুন্ডু
[পাঠ পর্যালোচনা ০৯] প্রথম আলো—নামটি যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের যে আন্দোলন কিংবা শিল্প সাহিত্যে যে নতুন জাগরণ শুরু হচ্ছিল—সেই সময়টাকেই যেন ‘প্রথম আলো’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসকে কেন্দ্র করে লেখা বইটিতে আমরা ইতিহাসের বাস্তব চরিত্রদেরকে উপন্যাসের চরিত্র রূপে পাবো। সেই সময় অর্থাৎ বিশ শতকে ইংরেজ শানসনামলে যেহেতু কলকাতাই ছিল ভারতবর্ষের প্রাণকেন্দ্র, রাজনীতি বা শিল্প সাহিত্যের উত্থান শুরু হয় কলকাতাতেই, তাই ‘প্রথম আলো’র কাহিনীও আবর্তিত হয়েছে কলকাতাকে ঘিরেই। লেখকের মতে ১৯৮৩ থেকে ১৯০৭ সাল এই সময়ের ভেতরে বইটির কাহিনী বিস্তৃত। ‘সেই সময়’ বইয়ের মতো এই বইয়েরও প্রধান চরিত্র হলো ‘সময়’। তবে একটা কথা বলে নেওয়া ভালো—অনেকেই ‘সেই সময়’ ‘প্রথম আলো’ এবং ‘পূর্ব পশ্চিম’ এই তিনটি বইকে সুনীলের ‘টাইম ট্রিলোজি’ বলে আখ্যা দেন। তবে বই তিনিটি তিন ভিন্ন সময়ের হলেও এবং সময়ের ধারাবিহকতা বজায় থাকলেও এরা কোন ট্রিলজির অন্তর্ভুক্ত নয়। এক বইয়ের সাথে নেই আরেক বইয়ের চরিত্রগত কোন সম্পর্ক। ‘সেই সময়’ এর সাথে ‘প্রথম আলো’র পটভূমি গত মিল থাকলেও নেই চরিত্রগত কোন মিল, আবার ‘পূর্ব পশ্চিম’ এর সাথে ঐ দুই বইয়ের একেবারেই মিল নেই, সেখানে বাস্তব সময়ের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ থাকলেও বাস্তব চরিত্রদেরকে উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র হিসেবে পাওয়া যায় না। তাই এই তিনটি মাস্টারপিস বইয়ের যেকোন বই দিয়েই আপনি আপনার পড়া শুরু করতে পারেন। আবার প্রকাশের কাল বা ঘটনা প্রবাহের কাল অনুসারেও উপরিউক্ত সিরিয়াল মোতাবেক পড়তে পারেন। স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্য থেকে কাহিনীর শুরু হয়ে কলকাতা কিংবা সূদুর ইংল্যান্ড আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বইয়ের কোন মূল চরিত্র না থাকলেও কাল্পনিকচরিত্র ভরতচন্দ্রের পাশাপাশি বাস্তবচরিত্র কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এই বইয়ের নায়ক বলে মনে হতে পারে। ইতিহাসেরে বিভিন্ন চরিত্রকে অবলম্বন করলেও এই দুই চরিত্রই প্রধান ভূমিকা অবলম্বন করে। বইটিতে উঠে এসেছে সেই সময় সাহিত্যজগৎ, মঞ্চনাট্যের অন্দরমহল, ধর্মীয় বিপ্লব সহ রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেসের উত্থান, মানুষের মনে যে স্বাধীনতার বীজ বপন হতে শুরু করেছে পাওয়া যাও তারও ইঙ্গিত। আমরা ঠাকুর বাড়ীর তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথের উত্থান যেমন দেখবো তেমনি পাবো উজ্জ্বল নক্ষত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের হারিয়ে যাওয়া, পাবো বউদির সাথে রবির নির্মল প্রেম এবং কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যাও, শেষের দিকে দেখবো কবির মধ্যে জমিদার সামলানো এবং সংসারের ভার বহনকারি নারীবর্জিতা একজন পিতাকে। তখন নাট্যজগতে যে জয়জয়কার শুরু হয়েছে সেই জয়ধ্বনিতে আমরা গিরিশচন্দ্রের নাম পাবো, পাবো বিনোদিনী নটীর কথা কিংবা অর্ধেন্দু শেখরের কথাও। দেখবো কালীভক্ত রামকৃষ্ণের উত্থান এবং তারই ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা নরেন দত্ত কীভাবে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে শিকাগো জয় করেন, তার সাথে জুড়ে যাওয়া সিস্টার নিবেদিতাকেও জানতে পারবো আমরা। জানবো ডা মহেন্দ্রলাল সরকার, জগদীশ চন্দ্র বসুর কথা। আবার এসবের সাথে সাথে উঠে আসবে কংগ্রেসের কথা। সেখান থেকে জানা যাবে সুরন্দ্রনাথ, জানকীনাথ ঘোষাল, সরলা ঘোষাল এবং প্রায় অপরিচিত মহাত্মা গান্ধীর কথা। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত, কংগ্রেরসের মধ্যে দ্বন্দ্ব, স্বদেশী আন্দোলন—এই পর্যন্ত গিয়ে সমাপ্ত হয় কাহিনীর। এখানে একটা আফসোসের কথা বলে রাখা ভালো। বইটা যেখান থেকে সমাপ্ত হয়েছে এর পর থেকে শুরু করে যদি ভারতের স্বাধীনতা অব্দি রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে একটা বই সুনীল লিখে যেতেন তবে পাঠকসমাজ যে খুব উপকৃত হতো তা বলতে দ্বিধা রাখে না। ইতিহাস কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠলেও নেই সাল বা তারিখের ছড়াছড়ি। তাই এটাকে কোন ইতিহাসের বই বলা চলে না। বরং বলা যেতে পারে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস, যেখানে ইতিহাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ের সারমর্ম, যা কিনা গল্পাকারে লেখক আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। দীর্ঘপরিসরের হলেও সুখপাঠ্য কালজয়ী এই বইটি বাংলা সাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ, যে কোন ঘরানার পাঠকেরই উচিত বইটি পড়া।
ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ও প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস 'প্রথম আলো'র সময়কাল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও ঊনবিংশ শতাব্দির শুরু।আটারোশো তিরাশি থেকে ঊনিশশো সাত।গাছের কান্ড যেমন ডালপালা মেলে বিস্তৃত হয়,তেমনিভাবে তৃপুরা রাজপরিবার থেকে এ উপন্যাসের শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে সমগ্র ভারতবর্ষে।দুধ যেমন অনেকের কাছেই অরুচিকর তেমনিভাবে ইতিহাসও বটে।কিন্তু দুধ থেকে তৈরী ক্ষীর প্রায় সবার কাছেই প্রিয়।লেখক এখানে দুধ থেকে ক্ষীর তৈরীর প্রক্রিয়াটাই অবলম্বন করেছেন বলে আমার মনে হয়। তিনি শুধুমাত্র কটকটে ইতিহাস না লিখে ইতিহাসের ছায়ায় লিখেছেন নানা শ্রেনীপেশার মানুষের জীবনের গল্প।স্বাধীনচেতা বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর নানান ঘটনা।লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে প্রখ্যাত নাট্যকার গিরীশ চন্দ্র সেন, জগদীশচন্দ্র,ডাঃমহেন্দ্রলালা দত্ত,স্বামী বেবেকানন্দ প্রমূখ বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে।এখানে ইতিহাসের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে গভীর জীবনদর্শন।জীবনের নানা বাকে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ।এই ঘটনাপ্রবাহের এক অন্যতম কাল্পনিক চরিত্র ভরত,এবং আর এক রহস্যময়ী নারী চরিত্র ভুমিসূতা।ভরতের জীবনে নেমে আসে একের পর এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়।যা উপন্যাসের শেষ অবধি চলতে থাকে।যমদূত ভরতের সাথে খেলতে থাকে মৃত্যুখেলা।আর ভুমিসূতা এক অনন্যসাধারণ নারী।যার জীবনপ্রবাহ সাধারন থেকে অসাধারনের দিকে ধাবিত হয়।স্বামী বিবেকানন্দ।যার কথা বিশেষ করে না বললেই নয়।নরেন্দ্র নামধারী এক কলেজ ছাত্রের বিবেকানন্দ হয়ে উঠার এক অসাধারন গল্প নিছক ইতিহাস নয়,তারও অধিক কিছু।যার মধ্যে রয়েছে এক সম্মোহনী শক্তি।মানুষ কে ভালবাসা ও ভালবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ করার এক অলৌকিক শক্তি। ঠাকুর পরিবার এ উপন্যাসের আর এক অন্যতম উপাদান। কাদম্বরী দেবীর বিলীন হয়ে যাবার গল্প ও রবীন্দ্রনাথের কবি হয়ে উঠার গল্প পাশাপাশি ছুটে চলেছে।এ যেন একে অপরের পরিপূরক। এছাড়াও উপন্যাসের উঠে এসেছে বাঙালীর স্বাধীনচেতা মনোভাবের সূত্রপাত।বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন।সূত্রপাত ঘটেছে বাঙালীর অধিকারবোধ ও আত্মসমানবোধ। শুধু সাহিত্যে নয় বিজ্ঞানেও এগিয়ে গিয়েছে ভারতবর্ষ যার হাত ধরে তার নাম জগদীশ্চন্দ্র।যিনি প্রথম প্রমান করেন মানুষের মতো গাছেরও প্রান আছে। নানা ঘটনার ঘনঘটায় এগিয়েছে উপন্যাস। কখনো গতি শ্লথ হয়েছে, কখনো এগিয়েছে দুর্বার গতিতে।কখনো হাসি আবার কখনো কান্নার স্রোত বইতে দেখা যায় উপন্যাসের বিভিন্ন বাকে। যা জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই 'প্রথম আলো' কেবল ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়,কেবল ইতিহাসকে অবলম্বন করে তৈরী গভীর জীবনবোধের উপন্যাস। ব্যাপ্তি বিশাল হওয়ায় মাঝে মাঝে কিছুটা বিরক্তি এসেছে,এসেছে অনীহা।তবে এই বিরক্তি লেখক সুনিপুনভাবে তার লেখায় আবার দূর করতে সক্ষম হয়েছেন।সে কারনেই একটা আকাঙ্কা তৈরী হয়েছে শেষ অবধি পড়বার।এবং শেষ হওয়া মাত্র কেবল একটা কথাই মনে হয়েছে,"শেষ হইয়াও হইলোনা শেষ'।আমি প্রায় বিহবল হয়ে থমকে গিয়েছিলাম পড়া শেষ করে।
প্রশ্ন ও উত্তর (Q/A)
original Indian book ? premium
প্রিয় গ্রাহক, জি, বইটি অরিজিনাল ইন্ডিয়ান বই, ধন্যবাদ।
original Indian book ? premium
প্রিয় গ্রাহক, জি, বইটি অরিজিনাল ইন্ডিয়ান বই, ধন্যবাদ।























