হৃদয়ের দখিন দুয়ার
বই কালেকশন

Buy হৃদয়ের দখিন দুয়ার Online in Bangladesh

লেখক: আবদুল্লাহ আল ইমরান

4.86
(25 টি কাস্টমার রিভিউ)| স্টকে আছে
Highlights:
  • Author: আবদুল্লাহ আল ইমরান
  • Publisher: অন্বেষা প্রকাশন
  • Isbn: 9789844350625
  • Number Of Pages: 294
  • Language: বাংলা
  • Edition: 3rd Edition, 2021
৳ 480৳ 60020% ছাড়
স্টকে আছে
উপলব্ধ প্রোমো কোডসমূহ:
দ্রুত ডেলিভারি
৭ দিনের রিটার্ন
১০০% অথেনটিক

পণ্য সারসংক্ষেপ (Summary)

“হৃদয়ের দখিন দুয়ার" বইটির ফ্ল্যাপ এর লেখাঃ মানুষের জীবনে প্রিয় মানুষের উপস্থিতি সব সময় চিরস্থায়ী হয় না। কোনাে সম্পর্ক টেকেও না চিরদিন। ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই এগােয় ছােট্ট এ জীবন। মানুষ যত বড় হয়, জীবন থেকে ক্রমে হারিয়ে যেতে থাকে প্রিয় চরিত্রেরা। তবে মানুষটা হারিয়ে গেলেও রেখে যায় মন কেমন করা স্মৃতি। হয়তাে সম্পর্কটা টেকেনি, হয়তাে হারিয়েছে সমুদয় অধিকার, কিন্তু গােলাপি টিপটা থেকে গেছে মানিব্যাগে, ক্যালেন্ডারের পাতায়, যে টিপ হঠাৎ হঠাৎ ভীষণ আবেগতাড়িত করে দেয়, ঝড় তােলে হৃদয়ে। বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা আস্ত গােলাপ যখন বেরিয়ে আসে নিঘুম কোনাে রাতে, কত কথা মনে পড়ে যায়, কত ব্যথা জাগে বুকে! এভাবেই নাকে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মােছা রুমাল, রাত জেগে লেখা চিঠি, দাঁতের আঘাতে তেলে যাওয়া কলমের খাপ, ক্লিপে লেগে থাকা চুলের ঘ্রাণ-হারানাে প্রিয় মানুষটাকে জাগিয়ে রাখে বুকে, কিছুতেই তারে দেয় না হারাতে! পরিস্থিতির চাপে, মামুলি ভুল-বােঝাবুঝিতে কিংবা জীবনের অমােঘ টানে মানুষটা হয়তাে হারায় জীবন থেকে, হয়তাে শেষবার ‘ভালােবাসি' কথাটাও বলা হয় না, কিন্তু বুকপাজরে থরে থরে সাজানাে স্মৃতি তারে ভুলতে দেয় না। টুকরাে উপহার, কাক্ষিত স্পর্শ, একসঙ্গে হেঁটে চলা হেমন্ত বিকেল তাকে বাঁচিয়ে রাখে, প্রতিটা দুপুর, কত যে বছর!

রিভিউ ও রেটিং (Review & Rating)

4.86
(25 টি কাস্টমার রিভিউ)
5
90%
4
10%
3
0%
2
0%
1
0%
অনন্যা জান্নাত
অনন্যা জান্নাত ভেরিফাইড
27 Aug 2024

হৃদয়ের দখিন দুয়ারঃ এক সংগ্রামী তরুণ লেখকের বেড়ে ওঠার গল্পকথা বইঃ হৃদয়ের দখিন দুয়ার লেখকঃ আবদুল্লাহ আল ইমরান প্রচ্ছদঃ সানজিদা পারভিন তিন্নি প্রকাশনাঃ অন্বেষা প্রকাশনী পৃষ্ঠাঃ ২৯৪ পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ হৃদয়ের দখিন দুয়ার কথাসাহিত্যিক আবদুল্লাহ আল ইমরানের এক অসাধারণ সৃষ্টি। এ উপন্যাসে তিনি জীবনের গল্পগুলোকে এঁকেছেন এক অনন্যাসাধারণ মহিমায়। কাহিনী বিন্যাসের পাশাপাশি সুনিপুন শব্দশৈলীতেও যে ঔপন্যাসিক ভীষণভাবে দক্ষ তা এ উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। তার লেখা একটাই মুগ্ধকর আর হৃদয়স্পর্শী যে তা পাঠ করার পর মনে হয় না যে তা অন্য কারো গল্প, মনে হয় যে তা আমার একান্তই নিজের; চিরদিন, চিরকালের পরিচিত! গল্পটির মূল কেন্দ্রজুড়ে নয়ন আর অবন্তী থাকলেও তাদের ঘিরে রয়েছে আরো বেশ কিছু চরিত্র যে চরিত্রগুলোর মাধ্যমে লেখক সমাজের নিম্নমধ্যবিত্ত খেটে খাওয়া, নির্যাতিত বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের প্রতিচ্ছবিকে এঁকেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়। নয়ন ও অবন্তী ছাড়াও এ উপন্যাসে রয়েছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সেগুলো হলো- আমেনা বেগম, আমিন, আবদুল্লাহ, সুলতান, রহমত, আশিসদা, বন্যাদি, শ্রাবন্তী ও শামসুল মাস্টার প্রমূখ। উপন্যাসটি শুরু হয় জীবন গড়ার তাগিদে খুলনার একটা মফস্বল থেকে ঢাকাতে ছুটে আসা এক তরুণ লেখকের নিরন্তর ছুটে চলার গল্পকে কেন্দ্র করে যে কীনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন ভীষণ মেধাবী ছাত্র ছিলো। শুধু লেখাপড়াই না বরঙ এর পাশাপাশি লেখালিখিতেও ছিলো তার ভীষণ ঝোঁক, বড় লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিক করবার অদম্য বাসনা। তার লেখা কবিতাগুলো প্রায়ই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হতো যে কারণে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ছাত্রের পাশাপাশি অনেকের কাছেই কবি নয়ন হিসেবেও পরিচিত ছিলো। বুকে অজস্র স্বপ্ন গেঁথে নিয়েই সে এ শহরে এসেছে আর প্রতিনিয়তই ছুটে চলেছে তার স্বপ্নগুলোকে বাস্তব রুপ দেবার ভীষণ তাড়নায়। স্বপ্ন দেখে যায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শে পৃথিবীটা বদলের, বৈষম্যহীন এক নিরপেক্ষ উদার উজাড় সমাজ গঠনের। সে উদ্দেশ্য গড়ে তোলে সুবিধাবঞ্চিত পথ শিশুদের নিয়ে 'আকাশভরা তারা' নামে অসাধারণ একটি স্কুল, যা কীনা তার এ পুঁজিবাদী সমাজের বিরুদ্ধে ছিলো এক নীরব প্রতিবাদ। আসলে শুরুতে সমাজের চিরচেনা পরিচিত রুপের বাইরে গিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়াটা এতটাও সহজ ছিলো না ওর, অনেক সমস্যার সমুক্ষিণ হতে হয়েছে তবু হার মানেনি সে, সমস্ত সমস্যাকে মোকাবেলা করেই তাদের তিন বন্ধুর গড়ে তোলা এ স্বপ্নের স্কুলটিকে ধীরপায়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে ওরা। শুধু এ স্কুল গড়ে তোলা বা চালিয়ে যাওয়া নয় বরঞ্চ খুব সহজ ছিলো না নয়নের হল জীবনের এ লেখাপড়াটাকে চালিয়ে নেওয়াটাও, টিঁকে থাকার তাগিদে যা খাওয়ার মতো নয় সেইসব বিস্বাদ সবজি, তরকারি, পানির মতো পাতলা ডাল, পাথরভরা ভাত খেয়েই বাঁচতে হয়েছে ওকে। আর শুধু তাইই না যে রুমে থাকবার কথা ছিলো মাত্র চারজনের সেইরুমের মেঝেতেই বিশ-বাইশ জনকে গাদাগাদি করে থাকতেও হয়েছে যেখানে কেউই কাউকে একইঞ্চি পরিমানও ছাড় দিতে রাজী ছিলো না। তবুও এত এত বাঁধা-বিঘ্ন, ঝড়-ঝঞ্ঝার পথ পাড়ি দিয়েও ভেঙে পড়েনি নয়ন, সকল প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে বাবা-মায়ের স্বপ্নকে সত্যি করে তুলতে নিরন্তর সংগ্রামটা চালিয়ে গেছে ও। এবার বলা যাক উপন্যাসের অপর একটি চরিত্র অবন্তী সম্পর্কে, অবন্তী হলো এককথায় নয়নের চোখে একটা সবুজ রঙা প্রজাপতি যে প্রজাপতিকে সে ধারণ করে রেখেছে হৃদয়ের গহীন গভীর অতলে চার-চারটি বছর ধরে তবু্ও ওকে কিচ্ছুটিই বুঝতে দেয়নি কখনও কিন্তু অনার্সের শেষ ক্লাসের দিন নয়ন সিদ্ধান্ত নেয় যে সে আজ অবন্তীকে তার হৃদয়ের সমস্তটা খুলে বলবে অথচ এদিক ওদিক তাকিয়ে সে কোত্থাওই অবন্তীকে দেখতে পেলো না। তারপর একসময় ডাচ পেরিয়ে মল চত্বরের দিকে এগোতেই দেখল অবন্তীকে আর পেছন থেকে ডাকল, 'অবন্তী? ' অচেনা ডাক কানে পৌঁছতেই থমকে দাঁড়ায় অবন্তী। এভাবেই ধীরে ধীরে শুরু হয় তাদের বাক্যালাপ যা ক্রমশই ডালপালা মেলতে থাকে আর নয়নও সুযোগ পেয়ে অবন্তীকে জানিয়ে দেয় তার হৃদয়ের সমস্ত গোপন অনুভূতিগুলোকে উজাড় করে! সবটুকু জানার পর অবন্তী যেমন বিস্মিত হয় তেমন নয়নের কাব্যিক কথা আর চাহনিতে মুগ্ধও হয়! এরপর কথা শেষ করে নয়ন ধীরে ধীরে নীলক্ষেতের দিকে পা বাড়ায় আর অবন্তী ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। দৃষ্টিজুড়ে অপার শূন্যতা, কিছুই বলতে পারো না। নয়নের একটি চাকরি খুব দরকার আসলে, চাকরির জন্য সে বহুদিন যাবত পাক্ষিক ম্যাগাজিন ও পত্রিকা অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে কিন্তু কিছুতেই কিছু না হওয়ায় এটা নিয়ে সে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছে এখন। এভাবে কখনো চাকরির খোঁজে বা অন্য কোনো কাজে এদিক ওদিক ছোটার সময় ও যখন কোনো রিকশায় ওঠে তখনই গল্প জুড়ে দেয় আবদুল্লাহ বা সুলতানের মতো ভাগ্যহত মানুষদের সাথে। যাত্রাপথে কথায় কথায় এমন সব মানুষদের কাছ থেকে শোনে ও ওদের স্বপ্নের কথা, শোনে বিভিন্ন ধরনের দুঃখবোধের কথাও ; এসব শোনার পর সে এক বিষন্নতার অতল গহীন স্রোতে তলিয়ে যায় যেন! শুধু এরাই না রহমতের মতো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বেদনাগুলোও নয়নকে গভীরভাবে স্পর্শ করে, ব্যথিত করে প্রবলভাবে। ওদিকে নয়নের অবন্তীর প্রতি মুগ্ধতার কথা শুনে শুনে অবন্তীও মনে মনে গাঁথতে থাকে নয়নকে নিয়ে এক গভীর ভালোবাসার পুষ্পার্ঘ্য ; অনার্সের পরীক্ষা শেষ হবার পর একটিবার নয়নের সাথে দেখা করবার জন্য অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে থাকে সে কিন্তু কোথাওই তাকে দেখতে না পেয়ে বিষন্নতায় পুড়ে যায় । তারপর বহুদিন পর হঠাৎ একদিন ক্যাম্পাসে ওদের দেখা হয়ে গেলে যখন ফোন নাম্বার আদান-প্রদানের হয় তখন ওদের যোগাযোগটা আবার নতুন করে শুরু হয়। এদিকে কুয়েত-মৈত্রী হলে ফিরে এসে কিছুই ভালো লাগে না অবন্তীর, ভীষণ বিষন্ন লাগে ওর, কত কত কী যে মনে পড়ে যায়, মনে পড়ে যায় কত শৈশব স্মৃতি, তার ভাগ্যহত বোন শ্রাবন্তীকে নিয়ে অপার বেদনার কথা যে কীনা ছোট্ট বেলায় মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে আর কখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেনি! তাই কিছু মনে রাখতে না পারা এই সরল ভুলো মনা মেয়েটি যেমন তার নিজের দুঃখের কারণ তেমন তার পরিবারেরও, মেয়েটার একটু ভালো থাকার আশার বিয়ে দিয়েছিল অবন্তীর বাবা শামসুল, স্কুল মাস্টার আনিসের সাথে কিন্তু তার যৌতুক নির্যাতনে শ্রাবন্তীকে আর ওরা ওর শ্বশুর বাড়িতে রাখতে পারে নাই, বাধ্য হয়েই ফিরিয়ে এনেছে আর তারপর ডিভোর্সও করিয়েছে। এসব কথা ভেবেই কীনা অবন্তীর দু-চোখ প্রায়শই বাঁধ মানে না, ঠিক এখনকার মতোই ভেসে যায় অথৈ অশ্রু প্লাবনে। তবুও আগে যা হোক শ্রাবন্তী কিছুটা ভালো ছিলো, এক ধরনের উচ্ছ্বলতা ছিলো ওর ভেতর কিন্তু দিনকে দিন ওর অবস্থা যেন আরো বেশি খারাপ হচ্ছে ; একেবারে অসুস্থ হয়ে পড়ছে, কিছু খেতেও চায় না আজকাল ও! আচ্ছা কী এমন অসুখ বাঁধিয়েছে অবন্তী যে দিনের পর দিন এত করুণ অবস্থা হচ্ছে ওর, শেষ পর্যন্ত মেয়েটা বেঁচে থাকবে তো ? একদিন হুট করে নয়নের কাছে একটা ফোন আসে, ফোন করে তার মা আমেনা বেগম জানায় যে তার বাবা মারা গেছে, খবরটা পাওয়া মাত্রই ক্যামন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে ওর চতুর্দিকে যেন, চোখদুটো ছলছল করে ওঠে, বুঝতে পারে যে পরিবারের হাল এবার ওকেই ধরতে হবে, এছাড়া আর কোনো গতি নেই। একদিন রুমে ঢুকতেই নয়ন হঠাৎ দেখতে পায় তার আশিসদাকে, আশিসকে দেখে নয়নের মনে পড়ে যায় তার ফেলে আসা সেই এক টুকরো শৈশবকে, ক্রিকেটকে নিয়ে একদল স্বপ্নবাজ তরুনের অপ্রতিরোধ্য উন্মাদনাকে যে উন্মাদনার বীজ, জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলার স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল একদিন ওদের এই আশিসদাই। কথোকথনের এক পর্যায়ে নয়ন আশিসকে বন্যাদির কথা জিজ্ঞেস করলে আশিস বলে যে কোনো খবর সে জানে না বন্যার, দেখাসাক্ষাতও হয়নি বহুদিন ওর সাথে। মামার আশ্রয়টুকু হারানোর ভয়েই নাকি সে আর কোনো চেষ্টা তদবিরই করেনি বন্যাকে পাওয়ার জন্য তবে এখনও খুব ভালোবাসে! আচ্ছা বন্যাদিও কী আশিসকে এমনভাবেই ভালোবেসে; আর মৃত্যুর পূর্বে যে ডায়রীখানা আশিস নয়নকে দিয়েছিলো বন্যাদিকে দেবার জন্য নয়ন কী সে ডায়রীখানা শেষ পর্যন্ত বন্যাদি পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলো? হুট করে একদিন নয়নের মা নয়নকে জরুরি তলব করে বসে, বলে খুলনাতে আসতে, খুলনা পৌঁছে জানতে পারে যে তার মা তার বোন আঁখির বিয়ে দিতে চায় কারণ বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকাতে তার বোনের দিকে মানুষের কুনজর পড়েছে, যে কোনো মুহুর্তে যে কোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে।কথাগুলো শুনে নয়নও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে আর তার বোন এবং মাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার কাছে শহরে নিয়ে যাবে বলে শান্তনা দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এরপর সে শহরে চলে আসে আর এবার কিছুদিন অপেক্ষার পর তার ঐ চাকরিটাও হয়ে যায় যদিও বেতন খুব বেশি না তারপরও খেয়ে-পরে কিছু অন্তত হাতে থাকে তাই এইবার সে তার মা-বোনকে নিজের কাছে নিয়ে আসবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এরই মধ্যে একদিন হুট করে আরেক কাণ্ড ঘটে, নয়নের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় অবন্তী, তার ফোন বন্ধ পাওয়াতে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ে নয়ন।তারপর মাসখানিক পর একদিন ঢাকা ফিরে চারুকলায় দেখা করতে বলে নয়নকে; তারপর নয়ন এলে অবন্তী নয়নকে তার পারিবারিক সমস্ত সংকটগুলোকে বুঝিয়ে বলে আর বলে যে এই মুহুর্তে তার পরিবারের অমতে যেয়ে তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নাহ। নয়ন প্রতিবাদ করে না, ছলছল চোখ নিয়ে নিশ্চুপে বিদায় নিয়ে নেয় অবন্তীর থেকে। এরপর বহু সময়ে পেরিয়ে যায়, প্রায় দেড় বছর, ওদের আর এর ভেতর কোনো কথা হয়নি, তারপর একদিন হঠাতই নয়ন এক ভোররাতে অবন্তীকে কল করে বসে, বলে সে এখন সুনামগঞ্জ, অফিসের কাজে এসেছে। এ কথা শুনে অবন্তী নয়নকে তাদের বাড়িতে আসতে অনুরোধ করে; নয়নও ছুটে যায় সমস্ত অভিমান ভেঙে, তাদের দেখা হয় বহুদিন পর, হয় চোখাচোখি ; বড় মাঠ ধরেঅবন্তীকে অনুসরন করে তার সাথে তাদের বাড়িতেও যায় নয়ন। এরপর সেখানে অবন্তীদের বাড়িতে পৌঁছে তাদের পরিবারের থেকে সে ভীষণ যত্ন-আতিথিয়তা পায়! কতদিন পর অবন্তীকে প্রাণ ভরে দেখতে পায় নয়ন, ওর ভীষণ ভালোলাগে কিন্তু অবন্তী যেন ক্যামন এড়িয়ে যেতে চায় ওকে, ওর করা প্রশ্নগুলোকে। তাই আর বেশি কথা বাড়াতে চায় না নয়ন, তাছাড়া ওকেও ওর অফিসের কাজে বেরোতে হবে তাই রাতটা কোনোরকমে পেরিয়ে সকাল হতেই বেরিয়ে যায় নয়ন অবন্তীদের বাসা থেকে তার নিজ গন্তব্যের দিকে। অবন্তীও আসে পিছু পিছু কিন্তু ওর চোখ দুটো একেবার ভেজা। নয়নও কাঁদছে অঝোরে। অবন্তী সামলে নেয় নিজেকে। বলে, আমাদের সবার হৃদয়েই একটা দখিন দুয়ার থাকে।সারা জীবন আমরা সেই দুয়ার খুঁজে বেড়াই, খুলতে চাই। দেখতে চাই মোহময় অদেখা ভুবন। কেউ কেউ সেই দুয়ার খুঁজে পায়। হয়তো খুলতেও পারে।কিন্তু সবার সে সৌভাগ্য হয় না। কী যেন নেই, কী যেন নেই করে কেটে যায় একটা জীবন। তবে এদের চেয়েও অভাগা কিছু মানুষ আছে, যারা সে অলৌকিক দরজাটা খুঁজে পেয়েও শেষ মুহুর্তে আর খুলতে পারে না। যেতে পারে না দরজার ওপাশে। আমি সেই অভাগার দলে, নয়ন। আমার দরজায় খিল আঁটা।আমার শুধু রাত হয়ে যায়। ' এরপর নয়নের হাতে একটা রুমাল তুলে দেয় অবন্তী। নয়ন কিছু বলতে চায়, বাঁধা দিয়ে অবন্তী বলে, জীবন আমাদের কখনো কখনো এমন মুহুর্তেন সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যখন না চাইলেও ভালোবাসার মানুষটাকে বিদায় জানাতে হয়। যদিও এর মানে এই নয়, আমরা মানুষটাকে আর ভালোবাসি না, খোঁজও রাখি নাকোনো তুমুল বিষাদে। কখনও কখনও বিদায়ও নিগূঢ় ভালোবাসা প্রকাশের হৃদয়বিদারক উপায় হয়ে ওঠে। ভাগ্যহত কেউ কেউ হয়তো সে উপায় বেছে নিতে বাধ্য হয়।' এভাবেই অবন্তী নয়নকে চির বিদায় জানায় তার জীবন থেকে আর এ চিরন্তন বিচ্ছেদের মধ্যে দিয়েই এ উপন্যাসের নিদারুণ পরিসমাপ্তি ঘটে।

kits bd
kits bd ভেরিফাইড
18 Jul 2023

★বই- হৃদয়ের দখিন দুয়ার ★লেখক- আবদুল্লাহ আল ইমরান ❝ জলের কিনারে জল ছুয়ে যায় ঢেউ, ভালোবেসে দূরে থাকে তবু কেউ কেউ।❞ সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল ইমরান এর অসাধারণ এক সৃষ্টি-‘হৃদয়ের দখিন দুয়ার'। পুরো উপন্যাস জুড়ে দারুণ এক ভঙ্গিমায় গল্প বুনে গেছেন লেখক। লেখকের ভাবনাজুড়ে সে কী বৈচিত্র্যতা!, তা এই উপন্যাস পড়লে অনেকটাই আঁচ করতে পারবে পাঠকমহল। এসব গল্প পাঠককে ভীষণ ভাবায়, পাঠকের মনকে আন্দোলিত করে তোলে, মোহিত হোন পাঠক, মুগ্ধতার এক রেশ তাদের ঘিরে রাখে। যেমনটা এই বেলায় আমার সঙ্গে ঘটেছে। এই গল্পটি নয়ন-অবন্তী যুগলপ্রেমের। ভালোবেসে তাদের কাছে আসার গল্প কিংবা রূঢ় বাস্তবতায় একে-অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বেদনামিশ্রত গল্প, দুইই লেখক গভীর মায়ায় সুনিপুণ দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন। কেবল নয়ন-অবন্তী যুগলকে ঘিরে গল্পটা তৈরি হয়েছে, এমন বলা হলে কিছুটা মিথ্যেই বলা হবে। কারণ ‘হৃদয়ের দখিন দুয়ার’ শুধুমাত্র নয়ন-অবন্তীর গল্পেই সীমাবদ্ধ রাখেননি লেখক, বরং এর পাশাপাশি নানান দৃশ্যপটের আবির্ভাব ঘটেছে সময়ের প্রয়োজনে। যা পুরো গল্পজুড়ে পাঠকের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে। এই যেমন- পথ শিশুদের জন্য নয়নের স্বপ্নের স্কুল ‘আকাশভরা তারা’, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সমাজে বিদ্যমান নানান অসঙ্গতি, শ্রেণিবৈষম্য, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের জীবনের কথকতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সামাজিক পরিস্থিতি, যৌতুক প্রথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনের করুণ ইতিহাস, প্রান্তিক জনপদের প্রতি রাষ্ট্রের অদায়িত্বশীল আচরণ, হাওর অঞ্চলের বেহাল দশা, কবিদের প্রতি সমাজের বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিটি ঘটনা গল্পে নতুন এক আবহ সৃষ্টি করেছে। মা-বাবা ও মিতুল-আঁখিকে নিয়ে নয়নের ছোট্ট পরিবার। বাবা কাঞ্চন মৃধা ছিলেন পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। হুটহাট বাবার মৃত্যুতে নয়নের পরিবার দিশেহারা হয়ে পরে। পরিবারের একমাত্র বটবৃক্ষের অসময়ে চলে যাওয়ার পর নয়নই হয়ে ওঠেছিল পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। অসহায় নয়নের কাঁধে এসে পড়ে অসংখ্য দায়িত্ব। জীবনের টানাপোড়েনে অসহায়ের মতো দিন কাটে নয়নের। তবুও দিনশেষে নতুন সূর্যোদয়ের আলোয় নিজের জীবনকে রঙিন করে তোলবার স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে পড়েনি নয়নের। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে গেছে সে। ক্লান্ত হয়েছে বহুবার, তবুও ক্ষান্ত হয়নি। যে সময়টায় লোকে ‘কবির চেয়ে কাকে সংখ্যা বেশি!’ বলো কটাক্ষে ব্যস্ত ছিল, সেই সময়ে কবি নয়নের কবিতায় বারংবার মুগ্ধ হয়েছে হাওর অঞ্চলের মেয়ে অবন্তী। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন যখন ক্রান্তিলগ্নে, সেই বিদায় বেলায় নয়ন-অবন্তীর কথা বলা শুরু। কথা না হওয়ারও সবিশেষ কারণ ছিল বৈকি! ক্লাসের ব্যাপারে নয়নে ছিল এলার্জি! ক্লাসে সে ছিল একমাত্র অমাবস্যার চাঁদ! এই অমাবস্যার চাঁদের দেখা পাওয়াটাই যেখানে দুষ্কর, সেখানে কথা বলতে বলতে বন্ধুত্ব সম্পর্কে জড়ানোটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল অবন্তীর জন্য। তবুও অবন্তীর ব্যাপারে নয়ন কিছুটা দুর্বল ছিল শুরুর সময় থেকেই। কিভাবে না কিভাবে জানি তাদের হরহামেশাই দেখা হত। কথা হয়, গল্প জমে। নয়নের ব্যাপারে বিস্তর জানা শুরু করে অবন্তী। একটা সময়ে সে আবিষ্কার করে ক্লাসের অযোগ্য ছাত্রটাই বেশ ভালো কবিতা লিখতে জানে। বিষয়টায় অবন্তী অবাকই হয় বটে। নয়নের এমন অসাধারণ সত্তা থাকা সত্বেও নিজের ক্যারিয়ারের ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা না থাকার ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে অবন্তী। সময়ের পরিক্রমায় নয়ন-অবন্তীর কথা বলাও বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন লম্বা একটা সময় ধরে যাদের মধ্যে কখনো কোনো কথাবার্তাই হয়নি, তাদের এমন হুটহাট করে নিয়মিত কথা বলাটা কি শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো রূপ নিবে? কে জানে! হন্য হয়ে একটা চাকরি বন্দোবস্ত করতে না পারলেও নয়ন কিন্তু ঠিকই ‘আকাশভরা তারা’ শিরোনামে তাঁর স্বপ্নের স্কুলটি শুরু করে দেয়। যে জায়গায় রহমত, আবদুল্লাহ'দের মতো তারাদের পড়ানোর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তোলো নেয় নয়ন। ‘ওত বড় মাপের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কী-ই বা হবে যদি চোখের সামনে অসহায় এই বাচ্চাগুলো পড়াশোনার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়!’-এমন ভাবনা নয়নের মনকে দুমড়েমুচড়ে একাকার করে ফেলে। কেঁদে ওঠে তার মন, ভালোবাসা জাগে তাদের প্রতি। ‘দ্যাশে যামুগা, এই শহর আর ভাল্লাগেনা’- নিজের নাম ধরে কেউ সম্বোধন না করায় একবুক অভিমান নিয়ে কথাগুলো রহমতের কণ্ঠে ঝরে। এ নিয়ে বেচারার দুঃখের ইতি নেই। কিংবা শুধুমাত্র গরীব বলে যখন রহমত হোটেলের চেয়ারে বসে মুরগি পোড়া খাওয়ার সুযোগ না পেয়ে রাগে-দুঃখে একাকার হয়ে পড়ে, তখন শ্রেণিবৈষম্যের শিকার রহমতের পাশে এসে দাঁড়ায় নয়ন। ভালোবেসে রহমতকে জায়গা করে দেয় তার স্বপ্নের স্কুলে। রহমতের এমন দুঃখ-দুর্দ্দশা দূরীকরণে তাকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব নেয় নিজ কাঁধে। রিক্সাচালক আবদুল্লাহর হাতে যখন মাত্র তিনশ টাকা তোলে দিল নয়ন, তখন তার মুখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে ওঠে। যেটা দেখে নয়নের মনে হতে থাকে, এই অল্প টাকা ব্যয়ে সে একজনের মুখে লাখ টাকার হাসি দেখার সুযোগ পেয়েছে। বিষয়টা নয়নের মনকে আন্দোলিত করে তোলে। সেদিনের সেই রিক্সাচালক আবদুল্লাহই একটা সময়ে গিয়ে নিজ পরিশ্রমে নিজের অবস্থান কিছুটা শক্ত পাকাপোক্ত করে। আচ্ছা, নয়নকে বলা আবদুল্লাহর তিনটি স্বপ্ন কি শেষ অবধি সত্যি হয়েছিল? নাকি সময়ের পরিক্রমায় স্বপ্নেরা মরে ভূত হয়ে গেছে? অসহায় মানুষদের বেলায় যেমনটা হয় আরকি! ‘তোরা আমার সংসারটা ভেঙে দিলি!’- অবন্তীর উদ্দেশ্যে শ্রাবন্তীর এই বাক্যটি একটি মেয়ের কাছে তার স্বামী সংসারের অপূর্ণতাকে তোলে ধরে। অবন্তীর বড় বোন শ্রাবন্তী। এই শ্রাবন্তী মেয়েটা অন্ধের মতো ভালোবাসত বর আনিসকে। আনিসও তাকে পরম যত্নে আগলে রাখে। সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না শ্রাবন্তীর। যৌতুকের বলী হতে হলো মেয়েটিকে। চোখের সামনে ভালোবাসার মানুষটিকে বদলে যেতে দেখল সে। স্বামীর অমানবিক নির্যাতনকে শিশুসুলভ মনে স্বামীর অধিকার বলে মানিয়েও নিয়েছিল সে। কিন্তু তারপরও অসামাজিক এই কুপ্রথার আঘাতে জর্জরিত হয়ে সংসারটি ভেঙে যায় শ্রাবন্তীর। তবুও স্বামী আনিসের ফেরার অপেক্ষায় থাকে সে। ভালোবাসা বোধহয় এমনই! স্বামী সংসার করতে না পারা, ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে ধরে রাখতে না পারা মেয়েটির জীবনকে আরও বেদনায় সিক্ত করে অ্যাডভান্স স্টেজে ধরা পড়া জরায়ু ক্যানসার। সেই ক্যান্সারের ছোবল থেকে শ্রাবন্তীকে ফেরানো সম্ভব হয়নি শেষ পর্যন্ত। অবন্তীর কোলে মাথা রেখে ভোররাতে মারা যাওয়া শ্রাবন্তীর জীবন কল্পনা করতে করতে ভাবছিলাম, আরেকটু কি সুন্দর হতে পারত না মেয়েটির জীবন? বেশি কিছু তো চায়নি সে। একটুখানি ভালোবাসা কি তাকে শেষ সময়ে দিত পারত না তার ভালোবাসার মানুষটা? কে জানত, ভালোবাসাকে ফিরে পেয়ে মেয়েটি হয়তো আরও কটা দিন চোখ মেলে সুন্দর এই পৃথিবীটাকে দেখার সুযোগ পেত!! হৃদয়ভাঙা সুলতানের জন্যেও মন কাঁদে নয়নের। এত ভালোবাসা পাওয়ার পরও কেউ কিভাবে কাউকে ছেড়ে অন্যের বুকে সুখ খুঁজে, ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়ে নয়ন। ‘একটা পোলা আছে ভাইজান। ওর লাইগাই বাঁইচা আছি। নাইলে বাঁচতাম না। বউ আমার আরেক পোলার লগে ভাইগা গেছে। কেমনে জানি সব ভুইলা গেল, আমি তো ভাই পারি না।’—কথাগুলো নয়নের উদ্দেশ্যে বলে মন খুলে গান ধরে সুলতান- “নয়ন খুঁজে পেয়েছে মনি, মনি খুঁজে পেয়েছে নয়ন দুটি মনকে ছুঁয়েছে দুটি মন!” নয়ন-অবন্তীর সম্পর্ক একটা সময়ে প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। তবে সেটা প্রকাশ পায় কম। বরং দু'জনের অনুভবে স্থায়ী বসত গড়তে শুরু করে ভালোবাসা নামক পবিত্র শব্দটি। অবন্তী নয়নের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অভ্যাসে পরিণত হয়ে পরেছিল। অবন্তীর নাকে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে দিতে ইচ্ছে করত নয়নের। প্রথম বেতনের টাকা থেকে খানিক ব্যয়ে সে একটা রেশমি চাদর কিনেছিল অবন্তীর জন্য। অপরদিকে অফিস থেকে পাওয়া নয়নের বাইকের পেছনে বসে থেকে কতবার যে তাকে স্পর্শ করেছে অবন্তী, তার ইয়ত্তা নেই। ওই সময়টুকুতে সে ভীষণ অনুভব করতে পারে নয়নকে। পুরো গল্পে যার জন্য সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হয়, সে হলো নয়নের আশিসদা। গতর খেটে সারা দিনে ত্রিশ টাকা কামানো মানুষটা দেড়শ টাকা খরচে নয়নের জন্য কিনে এনেছিল লতায়-পাতায় জড়ানো টি-শার্ট, ভালোবাসার আদিম গন্ধ ছিল যার শরীরজুড়ে। ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার তীব্র দহনে পুড়তে থাকা আশিসদা একদিন ঠিকই এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যায়। রেখে যায় ভালোবাসায় মোড়ানো একটি ডায়েরি। নয়ন কি ডায়েরিটা যথাস্থানে পৌঁছাতে পেরেছিল? আশিসদার হৃদয়ের কথা কি জানতে পেরেছিল বন্যাদি? নাকি বন্যাদি কোনো দিনও জানতে পারবে না কী গভীর মমতায়, অনুভূতির তীব্রতায় আশিসদা তাকে ধারণ করেছিল? একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাজাকার মনু মিয়ার মুখোশ খুলতে চেয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা, শামসুল উল্লাহ। কিন্তু ক্ষমতার জোর খাটিয়ে তাকে চাকরিস্থল থেকে বদলি করে পাঠিয়ে দেয়া হল অন্যত্র। এতে রাগে উত্তেজিত হয়ে, চরম অপমানবোধে মাইল্ড স্ট্রোক করেন শামসুল উল্লাহ। চোখের সামনে পিতাকে লাশ হয়ে ভাসতে দেখা শামসুল উল্লাহর রাগটা সত্যিকার অর্থে কার উপর? রাজাকার মনু মিয়া? নাকি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা? নাকি অপশক্তির বিরুদ্ধে হেরে যাওয়ায় রাগটা পুরোপুরি নিজের উপর? দিনশেষে এই সমাজে রাজাকার মনু মিয়ারা জিতে যায়, হেরে যায় শামসুল উল্লাহ'র মতো স্বাধীনতা পক্ষের মানুষজন!! পুরো উপন্যাস জুড়ে নানান ধরনের কবিতার সংযোজন গল্পের মাধুর্য্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। এছাড়া সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সম্পদের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে গল্পে, যা সময়ের গর্ভে বিলীন হতে বসেছে। এই সম্পদগুলো কেন আমরা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারছি না? এই ব্যর্থতা কাদের? জীবনের বহুবিদ অস্থিরতা, টানাপোড়েন আর দম বন্ধ করা মুহূর্তেও নয়ন ওর জীবনে অদ্ভুত এক শান্তির পরশ। যাকে স্পর্শ করলে, যাকে দেখলে এমনকি যার কথা ভাবলেই এক জীবনের দুঃখ ভুলে থাকা যায়। তাই হয়তো অবন্তী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত, এক জনমের স্মৃতি তৈরি হতে আক্ষরিক অর্থে একটা গোটা জনম লাগে না। আচ্ছা, মনে রাখার মতো একটা গোটা জীবন কি নয়ন-অবন্তী পাশাপাশি হাটতে পেরেছিল? নাকি মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান নয়ন আশাই করেনি হৃদয়ের দখিন দুয়ার খুলে তাঁর প্রজাপতিটা সারা জীবনের জন্য তার হোক? কি ঘটে শেষ পর্যন্ত? গল্পের শেষাংশে নয়নের মন কেমনের অনুভূতি কেমন একটা মন খারাপ দশা তৈরি করেছে! “তুমিও ভীষণ কষ্টে আছো জানি প্রবল স্রোতে ভাঙছে বুকের পাড় সব হারানো মানুষ যেমন কাঁদে তোমার চোখেও তেমনি হাহাকার।” পড়তে আপনাকে হবেই, হয় বই নয়তো পিছিয়ে!🌻 ✒️ Himadri Sharma 💜

Review Upload 1
Review Upload 2
8801308803744
8801308803744 ভেরিফাইড
27 Aug 2024

ইমরানেরগল্পকথাবুকরিভিউপ্রতিযোগিতা সমাজের বাস্তবিক জীবনের প্রতিচ্ছবিই যেন ❝ হৃদয়ের দখিন দুয়ার ❞ বইটি। হৃদয়ের অলৌকিক দরজা খুঁজে পেয়েও কিছু হতভাগ্য মানুষ তা খুলে দরজার ওপাশে যেতে পারে না! ♦বই সম্পর্কিত তথ্যাদি ঃ বইয়ের নাম ঃ- " হৃদয়ের দখিন দুয়ার "। লেখক ঃ- "আবদুল্লাহ আল ইমরান"। প্রকাশনী ঃ- "অন্বেষা "। প্রচ্ছদ ঃ- "সানজিদা পারভিন তিন্নি "। পৃষ্ঠা সংখ্যা ঃ- "২৯৪"। জর্নার / ধরন ঃ- "সমকালীন "। ♦️লেখক সম্পর্কিত তথ্য ঃ "আবদুল্লাহ আল ইমরান" শৈশব কৈশোরের মোহাগ্রস্ততা থেকে লিখেছেন একযুগ। খুলনার মফস্বল থেকে সবুজ অনুভূতি বুকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসায় ও শহুরে চাকচিক্যের মাঝে সে গেরুয়া অনুভূতি মুছে যায়নি। তাই তার লেখনির বড় অংশ জুড়ে থাকে প্রান্তিক মানুষের নিয়ত সংগ্রাম আর বারোয়ারি উপলব্ধিতে ঠাসা মোহান্ধ জীবনের গল্প। ❝হৃদয়ের দখিন দুয়ার ❞ বইটিতেও যেন লেখকের জীবনের অংশ মিশে আছে। বইয়ের অনেক জায়গা পড়ে মনে হয়েছে হয়তো লেখকের জীবনেও এমন কিছু ঘটেছে! নয়তো এত সুন্দর শব্দের মিশেলে প্রাণবন্ত বর্ণনা লিখলেন কি করে! ♦️ পাঠের প্রতিক্রিয়া ঃ ❝ হৃদয়ের দখিন দুয়ার ❞ বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলো ❝ নয়ন ❞ও ❝ অবন্তী ❞। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র নয়ন। অবন্তি তার সহপাঠী হওয়া সত্ত্বেও অনার্সের চতুর্থ বর্ষের মধ্যে একবারও তাদের আলাপ হয়নি।নয়ন অবন্তী কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের ক্লাসেই লক্ষ্য করেছিলো, প্রথম দেখায়ই ভালোলাগার এক অনুভূতি হৃদয়ে বসন্তের ছোঁয়া দিয়ে গিয়েছিলো। নয়ন ছিলো খুলনার মফস্বল থেকে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা এক যুবক। তার পরিবারের অবস্থা খুব নড়বড়ে ছিলো।তাই এসব নিয়ে আর আগায়নি সে। হলে থাকার কষ্ট, নিজের সারা মাসের খরচ জোগানোর চিন্তায় এসব নিয়ে গভীরে যাওয়ার সময় হয়নি তার। হয়তো সকল আর্থিক সংকটের মানুষের অবস্থাই এমন! কিন্তু সে তার ফাঁকফোকরে বন্ধুদের কাছ থেকে টুকটাক খবর রাখত অবন্তীর। বুকের মাঝে অবন্তী পাখির ডাক সযত্নে লালন করে গেছে। আর অন্যদিকে অবন্তী ছিলো সুনামগঞ্জের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা তার স্বভাব। সে সবসময় পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত ছিলো। তার পরিবার ও এক চাপা কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো। অনার্সের শেষ ক্লাসের দিন নয়ন তার সাথে কথা বলার জন্য এগিয়ে আসে। সেদিন নয়নের কথামালা তার হৃদয়ের বাঁপাশ নাড়িয়ে দেয়। সেদিনের পর সে বহু খুঁজেছে নয়নকে। নয়নের বাবা মারা যাওয়ায়। নয়নের পুরো পরিবারের উপর নেমে আসে বিপর্যয় আর অনিশ্চয়তা। পুরো পরিবারের ভার এখন নয়নের কাঁধে। মা ছোট ভাই আর বোনের দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। এদিকে নিজের খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার ভর্তি ফী, খাওয়ার খরচ সব কিছু যোগাড় করায় জন্য চাকরি খুঁজতে শুরু করল নয়ন। নয়নের লেখালেখির হাত ভালো ছিলো। তার কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো। তাই একটা পত্রিকা অফিসে ছোট একটা চাকরি মানে লেখা ছাপা হলে টাকা পাবে নাহলে না। প্রায় কয়েকদিন পর পর সম্পাদকের অফিসে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে সে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু তাও তাকে যেতে হবেই তাছাড়া কোনো উপায় নেই যে! চাকরি টা খুব প্রয়োজন। তারপর বহুদিন পরে আবার দেখা হয় অবন্তী আর নয়নের। কথাও হলো এবং চলে যাওয়ার আগে নাম্বার বিনিময়। তারপর ধীরে ধীরে তাদের একে অপরের অনুভূতি বাড়তে থাকে। ভালোলাগা একসময় তীব্র ভালোবাসায় রূপান্তর হয়। তাদের প্রেম চমৎকার টুকরো টুকরো অনুভূতি দিয়ে চলতে থাকে। মাঝে নয়নও ছোট একটা চাকরি পেয়ে যায়। যদিও তা থেকে বাড়িতে কোনো টাকাই পাঠাতে পারে না নয়ন। নিজের খরচই সব মেটানো যায় না এই অল্প টাকায়। তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে রাস্তার পথশিশুদের পড়া তো খোলা আকাশের নিচে, ফুটপাতে। সেটা নিয়েও নয়নের অনেক সপ্ন ছিলো। কিন্তু সরকারি স্বীকৃতি না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠান না থাকায়। এটা নিয়ে কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। নয়ন আর অবন্তীর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত গুলো কেটেছে একে-অপরের পাশাপাশি থেকে। কি চমৎকার অনুভব! যেন ভালোবাসার মুগ্ধতার চেয়ে বড় আর কিছু নেই। এই গল্পের প্রতিটা চরিত্র যেন আমাদের সমাজের আশেপাশে রোজই আমরা দেখি। রিক্সাচালক আবদুল্লাহ, আমিনের জীবনের গল্প, আশিসদা'র অপ্রকাশিত ভালোবাসার কষ্ট নিয়ে মারা যাওয়া, নয়নের মায়ের একার সংগ্রাম গ্রামের মধ্যে মেয়েকে আর ছোট ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে দেয়া মুহূর্ত। অন্যদিকে অবন্তী র অসুস্থ বোন শ্রাবন্তীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিলো। এর মধ্যেই তার বাবার চাকরিও চলে গেলো। অবন্তীর মাথায়ও দুশ্চিন্তার পাহাড় গড়তে থাকে। এমন অবস্থায় কি হবে তার পরিবারের? বাবা কি এতকিছু সহ্য করতে পারবে? তারমধ্যে নয়নের জন্য চিন্তা সবকিছু মিলিয়ে যেন অবন্তী খুব ভেঙে পরছিলো। তার বোন শ্রাবন্তীর ক্যান্সার হয়েছিলো। সে মারা গেলো। বোনকে সে খুব ভালোবাসত৷ তার স্মৃতি যেন অবন্তীর সমস্তটা জুড়ে ছিলো। শোক কাটিয়ে ওঠার পর বাবা তার বিয়ের জন্য ছেলে ঠিক করে। নয়নের কথাও তখন বাড়িতে বলার পরিস্থিতি নেই। কারণ সে এখন অবন্তীর দায়িত্ব নিতে পারবে না। নিজের ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে আসতে হয় অবন্তী কে। নয়নের ও কিছু করার ছিলো না। এক আকাশ সমান কষ্ট বুকে নিয়ে শেষদিন অবন্তীকে বিদায় জানাতে হয়েছিলো। আমাদের সকলের হৃদয়েই একটা দখিন দুয়ার থাকে। অনেকে তা খুঁজে পায় আবার কেউ কেউ পায় না৷ কিন্তু সবচেয়ে হতভাগা তারাই যারা সেই দরজা খুঁজে পেয়েও যেতে পারে না দরজার ওপাশে। দেখতে পারো না মোহময় ভুবন। অবন্তীও সেই হতভাগার দলেই। ♦️ পাঠক বইটি কেন পড়বে!? ঃ ❝হৃদয়ের দখিন দুয়ার ❞ এই বইয়ে লেখক নিজের লেখনীর মাধ্যমে চমৎকার ভাবে বর্ণনা করেছেন জীবনের কঠিন বাস্তবতা। অসম্ভব সুন্দর অনুভব আর ভালোবাসার মাধুর্যতার সুন্দর মুহূর্তগুলোর এত সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন যা প্রকাশ করার মতো না। পাঠক নিজে না পরলে কখনোই তা অনুভব করতে পারবে না। এই বইটি পড়তে গিয়ে কোথাও বিরক্তিভাব আসেনি। একবার ধরায়ই বইটি শেষ করে ওঠার মতো। এই বইটি পড়ে মনে হবে যে এ তো নিজের জীবনের গল্পই পড়ছি। কিভাবে এত সুন্দর বর্ণনায় লেখা! একজন লেখকের প্রকৃত স্বার্থকতা সেখানেই যখন পাঠক তার বাস্তব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারবে নিজেকে। ♦️ বইটির কিছু মুগ্ধতার কথা ঃ 🍁 বুকে ধরে রাখো বিগত ব্যাথা অভিযোগ তোলা থাক, দেখা হলে ফের মিলিয়ে নিয়ো কে যে কার অনুতাপ! 🍁 এক জনমের স্মৃতি তৈরি হতে আক্ষরিক অর্থেই একটা গোটা জনম লাগে না। লাগে একটা অলৌকিক মুহূর্ত। 🍁 মাঝে মাঝে সম্পর্কে বিরতি সম্পর্কগুলোকে আরও প্রগাঢ় করে, গভীরভাবে অনুভব করতে সাহায্য করে। 🍁 প্রিয় মানুষের চোখে মুগ্ধতা দেখার মতো আনন্দময় দৃশ্য পৃথিবীতে আর একটাও নেই। ♦️ বইটি থেকে শিক্ষা ঃ ♠️ মানুষের জীবনে প্রিয় মানুষের উপস্থিতি সবসময় চিরস্থায়ী হয় না। এটা মেনে নিয়েই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ♠️ যত ব্যর্থতাই আসুক, তার সামনে নিজেকে নত করা যাবে না। আত্মবিশ্বাস নিয়ে নতুন দিনের প্রস্তুতি নিতে হবে। ♦️ বইটির সমালোচনা ঃ কোনো কিছুই ত্রুটির উর্ধ্বে না। র্খুঁত ধরা যায় না এমন বই হওয়া সত্ত্বেও। খুঁত বলতে,,,,, কিছু জায়গায় অল্প বানান ভুল ছিলো। আশা রাখছি পরবর্তীতে এটা শুধরে দেয়া হবে। পাঠককে বইটি পড়ার পরামর্শ রইলো। আমার প্রিয় বইয়ের তালিকায় এটা অন্যতম। ❝ বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। বইয়ের চাদরে আবৃত মানুষ কখনো সঙ্গিহীন হয় না। ❞ রিভিউ দাতা ঃ আতিয়া রহমান।

Himadri Sharma
Himadri Sharma ভেরিফাইড
17 Jul 2023

#ইমরানেরগল্পকথাবুকরিভিউপ্রতিযোগিতা ❝ জলের কিনারে জল ছুয়ে যায় ঢেউ, ভালোবেসে দূরে থাকে তবু কেউ কেউ।❞ সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল ইমরান এর অসাধারণ এক সৃষ্টি-‘হৃদয়ের দখিন দুয়ার'। পুরো উপন্যাস জুড়ে দারুণ এক ভঙ্গিমায় গল্প বুনে গেছেন লেখক। লেখকের ভাবনাজুড়ে সে কী বৈচিত্র্যতা!, তা এই উপন্যাস পড়লে অনেকটাই আঁচ করতে পারবে পাঠকমহল। এসব গল্প পাঠককে ভীষণ ভাবায়, পাঠকের মনকে আন্দোলিত করে তোলে, মোহিত হোন পাঠক, মুগ্ধতার এক রেশ তাদের ঘিরে রাখে। যেমনটা এই বেলায় আমার সঙ্গে ঘটেছে। এই গল্পটি নয়ন-অবন্তী যুগলপ্রেমের। ভালোবেসে তাদের কাছে আসার গল্প কিংবা রূঢ় বাস্তবতায় একে-অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বেদনামিশ্রত গল্প, দুইই লেখক গভীর মায়ায় সুনিপুণ দক্ষতায় উপস্থাপন করেছেন। কেবল নয়ন-অবন্তী যুগলকে ঘিরে গল্পটা তৈরি হয়েছে, এমন বলা হলে কিছুটা মিথ্যেই বলা হবে। কারণ ‘হৃদয়ের দখিন দুয়ার’ শুধুমাত্র নয়ন-অবন্তীর গল্পেই সীমাবদ্ধ রাখেননি লেখক, বরং এর পাশাপাশি নানান দৃশ্যপটের আবির্ভাব ঘটেছে সময়ের প্রয়োজনে। যা পুরো গল্পজুড়ে পাঠকের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে। এই যেমন- পথ শিশুদের জন্য নয়নের স্বপ্নের স্কুল ‘আকাশভরা তারা’, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সমাজে বিদ্যমান নানান অসঙ্গতি, শ্রেণিবৈষম্য, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের জীবনের কথকতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সামাজিক পরিস্থিতি, যৌতুক প্রথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনের করুণ ইতিহাস, প্রান্তিক জনপদের প্রতি রাষ্ট্রের অদায়িত্বশীল আচরণ, হাওর অঞ্চলের বেহাল দশা, কবিদের প্রতি সমাজের বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিটি ঘটনা গল্পে নতুন এক আবহ সৃষ্টি করেছে। মা-বাবা ও মিতুল-আঁখিকে নিয়ে নয়নের ছোট্ট পরিবার। বাবা কাঞ্চন মৃধা ছিলেন পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। হুটহাট বাবার মৃত্যুতে নয়নের পরিবার দিশেহারা হয়ে পরে। পরিবারের একমাত্র বটবৃক্ষের অসময়ে চলে যাওয়ার পর নয়নই হয়ে ওঠেছিল পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। অসহায় নয়নের কাঁধে এসে পড়ে অসংখ্য দায়িত্ব। জীবনের টানাপোড়েনে অসহায়ের মতো দিন কাটে নয়নের। তবুও দিনশেষে নতুন সূর্যোদয়ের আলোয় নিজের জীবনকে রঙিন করে তোলবার স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে পড়েনি নয়নের। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে গেছে সে। ক্লান্ত হয়েছে বহুবার, তবুও ক্ষান্ত হয়নি। যে সময়টায় লোকে ‘কবির চেয়ে কাকে সংখ্যা বেশি!’ বলো কটাক্ষে ব্যস্ত ছিল, সেই সময়ে কবি নয়নের কবিতায় বারংবার মুগ্ধ হয়েছে হাওর অঞ্চলের মেয়ে অবন্তী। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন যখন ক্রান্তিলগ্নে, সেই বিদায় বেলায় নয়ন-অবন্তীর কথা বলা শুরু। কথা না হওয়ারও সবিশেষ কারণ ছিল বৈকি! ক্লাসের ব্যাপারে নয়নে ছিল এলার্জি! ক্লাসে সে ছিল একমাত্র অমাবস্যার চাঁদ! এই অমাবস্যার চাঁদের দেখা পাওয়াটাই যেখানে দুষ্কর, সেখানে কথা বলতে বলতে বন্ধুত্ব সম্পর্কে জড়ানোটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল অবন্তীর জন্য। তবুও অবন্তীর ব্যাপারে নয়ন কিছুটা দুর্বল ছিল শুরুর সময় থেকেই। কিভাবে না কিভাবে জানি তাদের হরহামেশাই দেখা হত। কথা হয়, গল্প জমে। নয়নের ব্যাপারে বিস্তর জানা শুরু করে অবন্তী। একটা সময়ে সে আবিষ্কার করে ক্লাসের অযোগ্য ছাত্রটাই বেশ ভালো কবিতা লিখতে জানে। বিষয়টায় অবন্তী অবাকই হয় বটে। নয়নের এমন অসাধারণ সত্তা থাকা সত্বেও নিজের ক্যারিয়ারের ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা না থাকার ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে অবন্তী। সময়ের পরিক্রমায় নয়ন-অবন্তীর কথা বলাও বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন লম্বা একটা সময় ধরে যাদের মধ্যে কখনো কোনো কথাবার্তাই হয়নি, তাদের এমন হুটহাট করে নিয়মিত কথা বলাটা কি শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো রূপ নিবে? কে জানে! হন্য হয়ে একটা চাকরি বন্দোবস্ত করতে না পারলেও নয়ন কিন্তু ঠিকই ‘আকাশভরা তারা’ শিরোনামে তাঁর স্বপ্নের স্কুলটি শুরু করে দেয়। যে জায়গায় রহমত, আবদুল্লাহ'দের মতো তারাদের পড়ানোর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তোলো নেয় নয়ন। ‘ওত বড় মাপের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কী-ই বা হবে যদি চোখের সামনে অসহায় এই বাচ্চাগুলো পড়াশোনার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়!’-এমন ভাবনা নয়নের মনকে দুমড়েমুচড়ে একাকার করে ফেলে। কেঁদে ওঠে তার মন, ভালোবাসা জাগে তাদের প্রতি। ‘দ্যাশে যামুগা, এই শহর আর ভাল্লাগেনা’- নিজের নাম ধরে কেউ সম্বোধন না করায় একবুক অভিমান নিয়ে কথাগুলো রহমতের কণ্ঠে ঝরে। এ নিয়ে বেচারার দুঃখের ইতি নেই। কিংবা শুধুমাত্র গরীব বলে যখন রহমত হোটেলের চেয়ারে বসে মুরগি পোড়া খাওয়ার সুযোগ না পেয়ে রাগে-দুঃখে একাকার হয়ে পড়ে, তখন শ্রেণিবৈষম্যের শিকার রহমতের পাশে এসে দাঁড়ায় নয়ন। ভালোবেসে রহমতকে জায়গা করে দেয় তার স্বপ্নের স্কুলে। রহমতের এমন দুঃখ-দুর্দ্দশা দূরীকরণে তাকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব নেয় নিজ কাঁধে। রিক্সাচালক আবদুল্লাহর হাতে যখন মাত্র তিনশ টাকা তোলে দিল নয়ন, তখন তার মুখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে ওঠে। যেটা দেখে নয়নের মনে হতে থাকে, এই অল্প টাকা ব্যয়ে সে একজনের মুখে লাখ টাকার হাসি দেখার সুযোগ পেয়েছে। বিষয়টা নয়নের মনকে আন্দোলিত করে তোলে। সেদিনের সেই রিক্সাচালক আবদুল্লাহই একটা সময়ে গিয়ে নিজ পরিশ্রমে নিজের অবস্থান কিছুটা শক্ত পাকাপোক্ত করে। আচ্ছা, নয়নকে বলা আবদুল্লাহর তিনটি স্বপ্ন কি শেষ অবধি সত্যি হয়েছিল? নাকি সময়ের পরিক্রমায় স্বপ্নেরা মরে ভূত হয়ে গেছে? অসহায় মানুষদের বেলায় যেমনটা হয় আরকি! ‘তোরা আমার সংসারটা ভেঙে দিলি!’- অবন্তীর উদ্দেশ্যে শ্রাবন্তীর এই বাক্যটি একটি মেয়ের কাছে তার স্বামী সংসারের অপূর্ণতাকে তোলে ধরে। অবন্তীর বড় বোন শ্রাবন্তী। এই শ্রাবন্তী মেয়েটা অন্ধের মতো ভালোবাসত বর আনিসকে। আনিসও তাকে পরম যত্নে আগলে রাখে। সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না শ্রাবন্তীর। যৌতুকের বলী হতে হলো মেয়েটিকে। চোখের সামনে ভালোবাসার মানুষটিকে বদলে যেতে দেখল সে। স্বামীর অমানবিক নির্যাতনকে শিশুসুলভ মনে স্বামীর অধিকার বলে মানিয়েও নিয়েছিল সে। কিন্তু তারপরও অসামাজিক এই কুপ্রথার আঘাতে জর্জরিত হয়ে সংসারটি ভেঙে যায় শ্রাবন্তীর। তবুও স্বামী আনিসের ফেরার অপেক্ষায় থাকে সে। ভালোবাসা বোধহয় এমনই! স্বামী সংসার করতে না পারা, ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে ধরে রাখতে না পারা মেয়েটির জীবনকে আরও বেদনায় সিক্ত করে অ্যাডভান্স স্টেজে ধরা পড়া জরায়ু ক্যানসার। সেই ক্যান্সারের ছোবল থেকে শ্রাবন্তীকে ফেরানো সম্ভব হয়নি শেষ পর্যন্ত। অবন্তীর কোলে মাথা রেখে ভোররাতে মারা যাওয়া শ্রাবন্তীর জীবন কল্পনা করতে করতে ভাবছিলাম, আরেকটু কি সুন্দর হতে পারত না মেয়েটির জীবন? বেশি কিছু তো চায়নি সে। একটুখানি ভালোবাসা কি তাকে শেষ সময়ে দিত পারত না তার ভালোবাসার মানুষটা? কে জানত, ভালোবাসাকে ফিরে পেয়ে মেয়েটি হয়তো আরও কটা দিন চোখ মেলে সুন্দর এই পৃথিবীটাকে দেখার সুযোগ পেত!! হৃদয়ভাঙা সুলতানের জন্যেও মন কাঁদে নয়নের। এত ভালোবাসা পাওয়ার পরও কেউ কিভাবে কাউকে ছেড়ে অন্যের বুকে সুখ খুঁজে, ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়ে নয়ন। ‘একটা পোলা আছে ভাইজান। ওর লাইগাই বাঁইচা আছি। নাইলে বাঁচতাম না। বউ আমার আরেক পোলার লগে ভাইগা গেছে। কেমনে জানি সব ভুইলা গেল, আমি তো ভাই পারি না।’—কথাগুলো নয়নের উদ্দেশ্যে বলে মন খুলে গান ধরে সুলতান- “নয়ন খুঁজে পেয়েছে মনি, মনি খুঁজে পেয়েছে নয়ন দুটি মনকে ছুঁয়েছে দুটি মন!” নয়ন-অবন্তীর সম্পর্ক একটা সময়ে প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। তবে সেটা প্রকাশ পায় কম। বরং দু'জনের অনুভবে স্থায়ী বসত গড়তে শুরু করে ভালোবাসা নামক পবিত্র শব্দটি। অবন্তী নয়নের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অভ্যাসে পরিণত হয়ে পরেছিল। অবন্তীর নাকে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে দিতে ইচ্ছে করত নয়নের। প্রথম বেতনের টাকা থেকে খানিক ব্যয়ে সে একটা রেশমি চাদর কিনেছিল অবন্তীর জন্য। অপরদিকে অফিস থেকে পাওয়া নয়নের বাইকের পেছনে বসে থেকে কতবার যে তাকে স্পর্শ করেছে অবন্তী, তার ইয়ত্তা নেই। ওই সময়টুকুতে সে ভীষণ অনুভব করতে পারে নয়নকে। পুরো গল্পে যার জন্য সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হয়, সে হলো নয়নের আশিসদা। গতর খেটে সারা দিনে ত্রিশ টাকা কামানো মানুষটা দেড়শ টাকা খরচে নয়নের জন্য কিনে এনেছিল লতায়-পাতায় জড়ানো টি-শার্ট, ভালোবাসার আদিম গন্ধ ছিল যার শরীরজুড়ে। ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার তীব্র দহনে পুড়তে থাকা আশিসদা একদিন ঠিকই এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যায়। রেখে যায় ভালোবাসায় মোড়ানো একটি ডায়েরি। নয়ন কি ডায়েরিটা যথাস্থানে পৌঁছাতে পেরেছিল? আশিসদার হৃদয়ের কথা কি জানতে পেরেছিল বন্যাদি? নাকি বন্যাদি কোনো দিনও জানতে পারবে না কী গভীর মমতায়, অনুভূতির তীব্রতায় আশিসদা তাকে ধারণ করেছিল? একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাজাকার মনু মিয়ার মুখোশ খুলতে চেয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা, শামসুল উল্লাহ। কিন্তু ক্ষমতার জোর খাটিয়ে তাকে চাকরিস্থল থেকে বদলি করে পাঠিয়ে দেয়া হল অন্যত্র। এতে রাগে উত্তেজিত হয়ে, চরম অপমানবোধে মাইল্ড স্ট্রোক করেন শামসুল উল্লাহ। চোখের সামনে পিতাকে লাশ হয়ে ভাসতে দেখা শামসুল উল্লাহর রাগটা সত্যিকার অর্থে কার উপর? রাজাকার মনু মিয়া? নাকি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা? নাকি অপশক্তির বিরুদ্ধে হেরে যাওয়ায় রাগটা পুরোপুরি নিজের উপর? দিনশেষে এই সমাজে রাজাকার মনু মিয়ারা জিতে যায়, হেরে যায় শামসুল উল্লাহ'র মতো স্বাধীনতা পক্ষের মানুষজন!! পুরো উপন্যাস জুড়ে নানান ধরনের কবিতার সংযোজন গল্পের মাধুর্য্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। এছাড়া সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সম্পদের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে গল্পে, যা সময়ের গর্ভে বিলীন হতে বসেছে। এই সম্পদগুলো কেন আমরা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারছি না? এই ব্যর্থতা কাদের? জীবনের বহুবিদ অস্থিরতা, টানাপোড়েন আর দম বন্ধ করা মুহূর্তেও নয়ন ওর জীবনে অদ্ভুত এক শান্তির পরশ। যাকে স্পর্শ করলে, যাকে দেখলে এমনকি যার কথা ভাবলেই এক জীবনের দুঃখ ভুলে থাকা যায়। তাই হয়তো অবন্তী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত, এক জনমের স্মৃতি তৈরি হতে আক্ষরিক অর্থে একটা গোটা জনম লাগে না। আচ্ছা, মনে রাখার মতো একটা গোটা জীবন কি নয়ন-অবন্তী পাশাপাশি হাটতে পেরেছিল? নাকি মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান নয়ন আশাই করেনি হৃদয়ের দখিন দুয়ার খুলে তাঁর প্রজাপতিটা সারা জীবনের জন্য তার হোক? কি ঘটে শেষ পর্যন্ত? গল্পের শেষাংশে নয়নের মন কেমনের অনুভূতি কেমন একটা মন খারাপ দশা তৈরি করেছে! “তুমিও ভীষণ কষ্টে আছো জানি প্রবল স্রোতে ভাঙছে বুকের পাড় সব হারানো মানুষ যেমন কাঁদে তোমার চোখেও তেমনি হাহাকার।” ★বই- হৃদয়ের দখিন দুয়ার ★লেখক- আবদুল্লাহ আল ইমরান ★রিভিউদাতা- হিমাদ্রি শর্মা পড়তে আপনাকে হবেই, হয় বই নয়তো পিছিয়ে!🌻

Review Upload 1
Review Upload 2
Fatema Tuz Zohora
Fatema Tuz Zohora ভেরিফাইড
28 Aug 2024

🔹২০০০ সালের দিকের ঘটনা, বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি জেতার সুবাদে তখন দেশের আনাচে-কানাচে ক্রিকেটের এক বিপ্লব ঘটে গেছে। ঠিক সেই সময় সেনহাটি স্কুলের ছেলেগুলোর বুকে হুট করে জাতীয় খেলোয়াড় হওয়ার এক দুরন্ত স্বপ্ন ঢুকিয়ে দিল আশিস কুমার ঘোষ। ছেলেগুলোর জন্য যেন এই আশিসদা ছিলেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। কিন্তু খুলনার শ্রমিক এলাকার কড়াগোনা হিসেবের সংসারে দু'মুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকা পরিবারগুলোর জন্য দামি ক্রিকেট সামগ্রী কেনা ছিল রীতিমতো বিলাসিতা। জীবনের অমোঘ বাস্তবতায় তাই ছেলেগুলোর আর ক্রিকেটার হয়ে ওঠা হয়নি। আর আশিসদার ও কপালে জোটেনি দেশসেরা ক্রিকেটারদের শৈশব গুরু হওয়ার তকমা। খুলনার সেই অভাব জর্জরিত শ্রমিক এলাকা, নিশ্চুপ দুপুরের মফস্বল ছেড়ে এবার আসা যাক জাদুর শহর ঢাকায়। এ শহর কারো দুঃখ কমাতে জানে না। কিন্তু জাদুবলে আড়াল করে রাখতে পারে তার বুকে জায়গা করে নেয়া প্রতিটি মানুষের দুঃখ, কষ্ট, হতাশা আর অপ্রাপ্তিকে। এ-শহর নাকি কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। সবাইকে পরম মমতায় বুকে টেনে নেয়; নাকি গ্রাস করে নেয় সমুদ্রের আগ্রাসী ঢেউয়ের মত? যে ঢেউয়ে খাবি খেতে খেতে মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে, ভালো থাকার স্বপ্ন দেখে। নয়ন আর তার পরিচিত কিছু মানুষ এই শহরে এসেছিলো দু'চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে। কারো প্রেমিকা, কারো জীবনসঙ্গী আর কারোর ছিল মা আর ভাইবোনকে একটা সুন্দর জীবন উপহার দেয়ার স্বপ্ন। 🔸এ শহরে স্বপ্ন দেখে রাস্তার পাশে শুয়ে বসে থাকা, আধবেলা খেয়ে থাকা রহমতের মত পথশিশুরা। সব হারানো আশিসদার মত অগণিত পথিক এ শহরে খোঁজে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই।🔸 বেঁচে থাকার এত স্বপ্নের মাঝে কারো কারো জীবনে আসে প্রেম; ❝আসা যাওয়া দু দিকেই খোলা রবে দ্বার – যাবার সময় হলে যেয়ো সহজেই, আবার আসিতে হয় এসো। সংশয় যদি রয় তাহে ক্ষতি নেই, তবু ভালোবাস যদি বেসো।।❞ রবি ঠাকুর এই কবিতায় কি সহজেই না বলে দিয়েছেন আসা যাওয়া দুই দিকের দ্বারই খোলা রবে প্রিয়তমার জন্য, কত সহজেই ভালোবাসা বা না বাসার স্বাধীনতা দিয়েছেন প্রিয় মানুষকে। কিন্তু আসলেই কি এত সহজে মেনে নেয়া যায় দূরত্বের বাঁধা, অপেক্ষার কষ্ট কিংবা ভালোবাসার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের পর্বতসম দায়িত্বের কাঠিন্য? ভুল বোঝাবুঝি কিংবা জীবনের ভাঙা গড়ার খেলায় হারিয়ে যায় কিছু মানুষ, কিন্তু স্মৃতি কি হারায়? এত সহজে কি ভোলা যায় প্রিয় মানুষের সাথে কাটানো কোনো মূহুর্ত? কোনো খরতপ্ত রোদ্রের দুপুরে, কিংবা কোনো বিষন্ন সন্ধ্যায় অথবা একলা জাগা কোনো গভীর রাতে হৃদয়ের কোণে ঠিকই উঁকি দেয় অতীতের ফেলে আসা মূহুর্তের টুকরো টুকরো স্মৃতি। 🔹কাহিনি সংক্ষেপ: ❝বাইরে যখন বাতাস হবে বৃষ্টি হবে অল্প শুরু হবে মেঘলাপরি আর ছেলেটার গল্প।❞ গল্পটা নয়ন আর তার মেঘলাপরি অবন্তীর। নয়নের চার বছর ধরে জমিয়ে রাখা অনুভূতির খেরোখাতা অবন্তীর সামনে মেলে ধরার সময় এসেছে। বন্ধুমহলে কবি নামে খ্যাত নয়নের কবি মনে তেমন ভয় নেই অনুভূতি প্রকাশে, নেই দ্বিধা। তবুও গোলাপী শাড়িতে অবন্তীর স্নিগ্ধ রূপ নয়নের মনে মুগ্ধতার কাঁপুনি ধরিয়েছিল। সেই মুগ্ধতা নিয়েই নয়ন অবন্তীকে এক সন্ধ্যায় বলেছিল তার মনের কথা। তবে কোনো প্রত্যুত্তরের আশা সে করেনি। নিজের অনুভূতি প্রকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল নয়ন। কিন্তু সেই সামান্য ক্ষণ, কয়েকটি ছন্দময় বাক্য অবন্তীর মনে ঝড় তুলেছিল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ ধেয়ে আসা সেই ঝড়ে তাকে একলা ফেলেই নয়ন চলে গেল অবন্তীর নয়নের আড়ালে। সেই ক্ষণকালের বাক্য বিনিময়ে অবন্তীর হৃদয় মাঝে জায়গা করে নিয়েছিল নয়ন। কিন্তু যে নিজে ধরা দিতে চায় না তাকে খুঁজে পাওয়া কি এতই সহজ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবন্তীকে ফের পেয়েছিল নয়নকে। শুরু হয়েছিল তাদের মিষ্টি প্রেমের গল্প। প্রচন্ড খরতাপের পর এক পশলা শান্তির বৃষ্টির মত প্রেম নেমে এসেছিল নয়ন-অবন্তীর জীবনে। কিন্তু এই শান্তির বৃষ্টি একা আসেনি, সাথে যেন নিয়ে এসেছিল অশান্তির কালো মেঘ; সে মেঘ তার বুকে নিয়ে এসেছিল বিরহের বজ্র। যে বজ্রের আঘাতে আলাদা হয়ে যায় নয়ন অবন্তীর পৃথিবী। কিন্তু মেঘের আড়ালে সূর্যের উজ্জ্বলতা তো কখনো মলিন হয় না। তাহলে কি নয়ন-অবন্তীর জীবনে আরেকবার উঁকি দেবে কোনো রৌদ্রজ্বল স্নিগ্ধ সকাল? যে সকালে পাখিরা ফের ঠোঁটে করে নিয়ে আসবে প্রেমের বার্তা; ছড়িয়ে দেবে ধূলি-ধূসর শহরের আনাচে কানাচে। এছাড়া নয়নের স্কুল আকাশভরা তারা এর ছোট্ট তারাদের গল্প, আশিসদার মত হতভাগ্য এক প্রেমিক পুরুষের গল্প উপন্যাসকে পরিপূর্ণ করেছে। 🔹পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ ◑ হৃদয়ের দখিন দুয়ার এক নির্মল প্রেমের উপন্যাস। রোমান্টিক উপন্যাস হলেও শুধুমাত্র নায়ক নায়িকাকেন্দ্রিক প্রেম সর্বস্ব উপন্যাস নয় এটি। সম্পর্কের স্নিগ্ধতার আড়ালে এখানে উঠে এসেছে জীবনের বাস্তবতা, সংগ্রাম, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব। এই সংগ্রাম কিংবা দায়িত্বের মুখোমুখি হতে হয় প্রায় সকলকেই। তাই উপন্যাসের চরিত্রের সাথে আত্মিক, মানসিক সংযোগ সহজ হবে পাঠকের জন্য। রোমান্টিক উপন্যাস বলে শুধু প্রেমেই গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি লেখকের কলম। বইয়ে উঠে এসেছে মধ্যবিত্ত দুই পরিবারের গল্প, উঠে এসেছে সমাজের, প্রশাসনের কলুষিত দিক। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোই ধরণীর আসল রূপ দেখতে পায়- এই কথার সত্যতা যেন বইয়ের প্রতি চরিত্রের মাঝে ফুটে উঠছে। পিতৃহীন পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে নিজের শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে একটা চাকরির পিছে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো নয়নের অসহায়ত্ব, বাবা মা কে ভালো রাখতে ভালোবাসার মানুষকে ভুলে তাদের ইচ্ছা পূরণ করা অবন্তীর নিজের সাথে যুদ্ধ, বড় মেয়ে শ্রাবন্তীর খুশির জন্য মেয়ের শ্বশুরবাড়ির আবদার মেটাতে অপারগ বাবা, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজের স্বপ্নের পিছে ছুটতে থাকা আশিসদার টাকার অভাবে স্বপ্নভঙ্গ; এসব যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, সমাজের অন্ধকার দিক, দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের রূপ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ◑ উপন্যাসে নয়ন অবন্তীর গল্পের পাশাপাশি এসেছে পারিপার্শ্বিক চরিত্রের ছোট ছোট কিছু গল্প। এসব গল্পের নায়ক আশিসদা কিংবা রহমতের মত হতভাগ্যরা। এই গল্পগুলো উপন্যাসকে অন্য এক যুগোপযোগী মাত্রা দিয়েছে। পথশিশুদের শিক্ষাদানের মত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় লেখক রহমতের মত ছোট্ট একটি চরিত্রের সংলাপের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন করুণ বাস্তবতায়। আবার আশিসদা কিংবা অবন্তীর বাবার সাথে হওয়া অন্যায়ের মধ্য দিয়ে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন এই সমাজের অন্ধকার দিক। যেখানে দূর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলে, আর সবলের টাকার প্রভাবে সমাজের অন্যদের চোখ থাকতেও তারা অন্ধের মত আচরণ করে। যেখানে টাকা কিংবা ক্ষমতা না থাকলে মুখ ফুটে নিজের ন্যায্য অধিকারটুকুও দাবি করা যায় না; যেখানে মুখ বুজে সহ্য করতে হয় ক্ষমতাশালীদের সব অন্যায়; যেখানে নেই বাক স্বাধীনতা, নেই স্বাবলম্বী হবার স্বাধীনতা। বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শ্রাবন্তী। সহজ সরল এই মেয়েটির জীবনের সুখও বিক্রি হয়ে যায় টাকার কাছে। শ্রাবন্তীর জন্য বই পড়ার পর পাঠকের মন বিষাদে ভরে যাবে, জীবন মানে স্বল্প আয়ুর বাস্তবতা মেনেও ঘাসফুলের মত অবাক ফুটে থাকা। বইয়ে সমাজ, পরিবার, ব্যক্তিগত বাস্তবতা এত স্বচ্ছভাবে উঠে এসেছে যেন কোনো না কোনো পর্যায়ে, কোনো না কোনো লাইনে প্রতিটি পাঠক তার নিজের জীবনে মিল খুঁজে পাবেন। প্রতিটা লাইন আপনাকে ভাবাবে, আপনার নিজের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ◑ এক প্রেমকাহিনীর ছায়ায় লেখক এনেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঙালিদের একমাত্র লজ্জা ছিল বিশ্বাসঘাতক রাজাকার বাহিনিসহ অন্যান্য অপশক্তি। টাকার প্রভাবে যারা আজও নির্লজ্জের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে এই স্বাধীন দেশের মাটিতে। এই যে বুক ফুলিয়ে গর্বভরে আমরা স্বাধীনতার বাস্তব গল্প বলে বেড়াই, বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে মাঝে মাঝে তা যেন অবাস্তব রূপকথা মনে হয়। সত্যিই কি এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে এমন সমাজ পেয়েছি!? সেই রক্তের মূল্য কি এতই কম ছিলো যে আজকের সমাজে নিম্নবিত্তদের কিংবা মধ্যবিত্তদের কোন জায়গা নেই। যে সমাজে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলা সরকার মেটাতে পারে না সেখানে গণতন্ত্রের বয়ান দিয়ে কত দিন অভাগা মানুষগুলো দূর্যোগ পোহাবে? এই অসমতার পাবার জন্য তো আমরা দেশটা স্বাধীন করিনি। উপন্যাসের গভীরে ঢুকে আপনিও মনের অজান্তেই খুঁজবেন এত কষ্ট করে অর্জিত স্বাধীনতা আসলে কোথায়? ◑ এতসব কঠিন বাস্তবতা ছাড়াও লেখক এদেশের বিভিন্ন স্থানের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন গল্পে গল্পে। সুনামগঞ্জ এর বিভিন্ন ইতিহাস, হাসন রাজার গল্প লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পের আদলে। লিখেছেন টিএসসিতে থাকা একটি গ্রিক স্থাপনার কথা যার আসল ইতিহাস সম্পর্কে প্রায় কেউই অবগত নয়। আমাদের হয়তো অতীতকে স্মরণ করার, রোমন্থন করার চেতনাই চলে গিয়েছে। নাহলে টিএসসিতে সারাদিন ঘুরতে আসা, আড্ডা দিয়ে আসা হাজারো মানুষ দুইপা দূরের এই অসামান্য কীর্তির কথা বলে না কেনো? বইটির একটা বিশেষ আকর্ষণীয় দিক হল লেখকের বর্ণনাভঙ্গি। কাব্যিক উপমার সুঁতোয় গাঁথা প্রতিটি লাইন মনে ছাপ ফেলে যাওয়ার মত, এক জনমের স্মৃতি তৈরী হতে আক্ষরিক অর্থেই একটা গোটা জনম লাগে না। লাগে একটা অলৌকিক মুহূর্ত। বইয়ের নায়কের কবি স্বভাবের বদৌলতে পাওয়া কিছু ছোট ছোট প্রেমের কবিতা উপন্যাসের মাঝে বেশ ব্যতিক্রমী অনুভূতি যুক্ত করেছে। উপন্যাসে নয়ন-অবন্তী দুইজনের পরিবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মূলত পরিবারকে কেন্দ্র করেই গল্পের ভাঙা-গড়া। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে অবন্তীর পরিবারের গল্প বলা হলেও, নয়নের পরিবার রয়ে গিয়েছিল আড়ালে। ঢাকায় আসার পর নয়নের পারিবারিক অবস্থা নিয়ে কিছুটা বর্ণনা থাকলে বেশ হত বলে মনে হয়েছে আমার। হৃদয়ের দখিন দুয়ার বইটি যেন স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া একটা ক্যানভাস। যেখানে লেখক তুলির আঁচড়ে একের পর এক ফুটিয়ে তুলছেন প্রতিটি চরিত্রের জীবন। পাঠক যেন ঠিক লেখকের পিছে দাঁড়িয়েই অপলক চোখে দেখছে সেই শিল্পকর্ম। বেদনার নীল, ভালোবাসার লাল, অপশক্তি, দূর্নীতির কালো আরও কত রঙ লেখক ছিটিয়ে দিয়েছেন ক্যানভাসে। তুলির শেষ আঁচড়ের রঙ কি হবে তা নাহয় আজ তোলাই থাক। 🔹শেষ হয়েও হইলো না শেষ মাঝেমধ্যে কিছু বই পড়তে গিয়ে দেখবেন লেখকের লেখনী, বর্ণনার ভঙ্গিতে এতটাই বাস্তব হয়ে ওঠে যেন মনে হয় আমি সেই বইয়ের পাতায় হেঁটে বেড়াচ্ছি। এই বইটিও ঠিক সেরকম। শেষ হয়েও এই বইয়ের রেশ রয়ে গেছে মনের গভীরে। বই খোলার পর একের পর এক চমক অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। যতই বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি মনে হচ্ছে আমি যেন হাঁটছি নয়নের পিছু পিছু। আমার ক্যাম্পাস, হল, রাস্তা সব কত বাস্তব। এমনকি তোরণের কাছে থাকা সেই গাছটাও যার নিচে দাঁড়িয়ে নয়ন অবন্তীর সামনে খুলে দিয়েছিল তার হৃদয়ের অনুভূতির ঝাঁপি। এরপর হয়ত ওই গাছের দিকে তাকালে আমারও দৃষ্টিভ্রম হবে। মনে হবে ওই তো দাঁড়িয়ে উস্কোখুস্কো চুলের এক ছেলে আর আর গোলাপী রঙের শাড়ি পরা এক অপরূপা। এরপর এলো আমার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের শহর খুলনা। যেখানে নয়নের মত আমার আপনজনেরা থাকে। যখন পড়ছিলাম প্রতিটি শব্দ যেন আমার মগজে সাজিয়ে তুলছিল এই পরিচিত রাস্তার বাঁক, চেনা বাতাসের গন্ধ। প্রতিটি পরিচিত জায়গার নাম, বর্ণনা আমার ঠোঁটের কোণে এনে দিচ্ছিল প্রশান্তির হাসি। সব মিলিয়ে বইটি আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে দীর্ঘ সময়ের জন্যই। হয়তো একদিন আমিও এখানে থাকব না কিন্তু সব প্রস্থান মানেই চিরবিদায় নয়। কিছু বিদায় তো ফিরে আসার প্রত্যয়ও রেখে যায়। বই : হৃদয়ের দখিন দুয়ার লেখক : আবদুল্লাহ আল ইমরান প্রকাশনী : অন্বেষা প্রকাশন নাম: ফাতেমা তুজ জোহরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জেলা: খুলনা

প্রশ্ন ও উত্তর (Q/A)

দুঃখিত, কোনো প্রশ্ন উত্তর পাওয়া যায়নি।

সাদৃশ্যপূর্ণ পণ্যসমূহ (Similar Products)