চন্দ্রলেখা
বই কালেকশন

Buy চন্দ্রলেখা Online in Bangladesh

লেখক: আবদুল্লাহ আল ইমরান

4.41
(13 টি কাস্টমার রিভিউ)| স্টকে আছে
Highlights:
  • Author: আবদুল্লাহ আল ইমরান
  • Publisher: অন্বেষা প্রকাশন
  • Language: বাংলা
  • Edition: 1st Published, 2020
৳ 376৳ 47020% ছাড়
স্টকে আছে
উপলব্ধ প্রোমো কোডসমূহ:
দ্রুত ডেলিভারি
৭ দিনের রিটার্ন
১০০% অথেনটিক

পণ্য সারসংক্ষেপ (Summary)

চন্দ্রলেখা শশীর গল্প, যাকে তার দাদা চন্দ্র নামে ডাকে। গল্পটা লায়লা বানুরও। আঠারোবাঁকির তীরে দুই নারীকে ঘিরে আরও কিছু অদ্ভুত ও জটিল মানুষের গল্প নিয়েই এই উপন্যাস, যাতে আদর্শচ্যুত বড় কঠিন এক সময়কে ধরতে চেয়েছেন লেখক। অস্থির সেই সময়টা আপনি চেনেন, হয়তো মানুষগুলোকেও।

রিভিউ ও রেটিং (Review & Rating)

4.41
(13 টি কাস্টমার রিভিউ)
5
46%
4
46%
3
8%
2
0%
1
0%
Reon Marshall
Reon Marshall ভেরিফাইড
12 Oct 2024

লেখক আবদুল্লাহ আল ইমরানের ভাবনায়, তার কলমে অদম্য এক শক্তি আছে যা পাঠককে বিমোহিত করে তোলে। উপন্যাসের প্রতি প্লটে প্লটে, প্রতিটি বাক্যেই যে আকাঙ্খা রয়েছে পরের লাইনটি, পরের কাহিনীটি জানবার তা সত্যি লেখকের সফলতাকেই উন্মুক্ত করে। উপন্যাসটিতে রয়েছে বেশ কিছু রহস্য মিশ্রিত চরিত্র। অসহায়, বিপদাপন্ন, দিশাহারা, অভিভাবকহীন দুই নারীর কঠিন বাস্তবতার জীবনবৃত্তান্ত। যেখানে কখনও দেখা যায় ভদ্র, সভ্যরূপী ক্ষতিকারক, নীচ মন-মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তির অবিরত অবস্থান, পাশে থাকার নাটকীয় অভিনয়, আবার কখনও মনোবল বৃদ্ধি করে, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়ে জীবনের কঠিন লড়াই লড়ে যেতে উৎসাহ দেওয়ার মানুষও। আবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হতেও দেখা যায়। সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে থাকা কামুক, লোভীর বিচরণ যেমন রয়েছে তেমনি বিপদে কোনো দিক বিবেচনা না করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে উপকার করার মানুষও রয়েছে এই উপন্যাসে। উপন্যাসটিকে ঘিরে বাস্তবতার নির্মম এমন এক পরিহাস ফুটিয়ে তুলেছে লেখক যেখানে পাঠকের দৃষ্টির আড়াল, মনের আড়াল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই কাহিনি থেকে। পাঠক যেন নিজেই বিস্তরণ করছে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শশীর অবস্থানে। শুরুতে এবং মধ্যে মধ্যে মনে নির্দয় এক আঁচড় কেটে যায় যা উপন্যাসের শেষ প্রান্তে এসে নির্মল আনন্দের আভাসও দেয়। উপন্যাসটির শুরু হয় শশী ও তার ছয় বছর বয়েসের ছোট ভাই হাবুর শুকনো পাতা কুড়ানোর মধ্য দিয়ে। চন্দ্রলেখা উপন্যাসের লায়লা বানু তার স্বামী মোক্তার মিয়া, কেরোসিনের চুলায় রান্না করা খাবার খেতে পারে না জন্য, তিনি শুকনো পাতা দিয়ে রান্না করে। এতে তার অনেক কষ্ট হলেও তিনি এভাবেই রাঁধেন। মোক্তার মিয়া, লায়লা বানু, শশী ও হাবু চার জনের ছিলো যেন সুখী একটি পরিবার। শশীকে তার দাদা আদর করে চন্দ্র নামে ডাকতো। কিন্তু দাদার মৃত্যুর পর বাবাই তাকে এই নামে ডাকতো। বংশের প্রথম সন্তান চাঁদের মত সুন্দর হলেও তার জীবন চাঁদের আলোয় নয় বরং অমাবস্যার অন্ধকারে ছেয়ে থাকে। যেখানে মাঝে মধ্যে আলোর কিরণ পড়লেও মুহুর্তেই কালবৈশাখীর ঝড়ে সব এলোমেলো করে দেয়। হঠাৎ করাতকল থেকে শশীর বাবা মোক্তার আলীকে বীনা অপরাধে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এরপরই মা-মেয়ের চরম সংগ্রামী জীবন শুরু হয়। দিঘলিয়া থানা, আতাহার চেয়ারম্যান, আদালত, গঞ্জ, শশীর দৃঢ় কন্ঠে বাবার নিরপরাধ এর ব্যক্ত কথা। অবিরত এই তিক্ত জীবন পাড়ি দিতে হয় শশীদের। অভাবের হাহাকার যদিও-বা গোপন করা যায়, অর্থের বা ক্ষমতার উচ্ছ্বাস মানুষ গোপন রাখতে পারে না এসব ভাবতে ভাবতে শশী কিছুতেই তার বাবার বিরুদ্ধে খুনের দায়, আন্ডারগ্রাউন্ড এর পার্টি করা এসবের সমীকরণ মেলাতে পারে না। বন্ধুরূপী শয়তান, ভালো মানুষ রূপী ক্ষতিকারক ব্যক্তি, মুখোশধারী বিদঘুটে কোনো লোকের কুদৃষ্টি যখন কোনো সরল, সাধাসিধে মানুষের উপর বর্তায় তখন আর তার সোনার সংসার কিংবা তিনি নিজেই টিকে থাকতে পারেন না, ভস্ম হয়ে যান কুচক্রী, বিশ্রী সে ষড়যন্ত্রের কাছে। যেমনটা দেখা যায় উপন্যাসের মোক্তার মিয়ার চরিত্রে। যে মানুষ একটা পিঁপড়ে মরলে কষ্ট পায়, কী করে সে মানুষ একটা লোক খুন করবে ভেবে পায় না মা-মেয়ে। চেয়ারম্যান এর ধ্বংসকৃত, নোংরা এই বিছানো জালের কোনো রকম আভাস শশী আর তার মা বিন্দুমাত্র টের পায় নি শুরু থেকে শেষের চরম দুর্ভোগ পর্যন্ত। অনেকগুলো দিনের অপেক্ষা - তিতিক্ষার পর শশী, তার মা ও ছোট ভাই হাবুকে নিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যায়। শত চিন্তার পাহাড় একদিকে সরিয়ে শশী তার বাবাকে জামিনের আশ্বস্ততা দেয়। মোক্তার মিয়া উচ্চ কণ্ঠে মেয়ে কে বলে, কাউকে বিশ্বাস না করতে, বিশ্বাস করেই তার যে বাজে পরিণতি হয়েছে। কথা শেষ না হলেও সেসময় প্রবল ভীড়ে ছিটকে পরে ছিন্ন হয় তারা। মাথার উপর ছাদ না থাকলে, পিতাহীন, স্বামীহীন অবস্থায় নারীর যে দুর্ভোগ, দূর্দশা, সমাজের কিছু নিকৃষ্ট লোকের যে খারাপ নজর সব সময়ের জন্য স্থির থাকে তার বাস্তব চিত্র দেখা যায় আবদুল্লাহ আল ইমরানের চন্দ্রলেখা উপন্যাসে। এরপরই শশীর জীবনে শুরু হয় ভিন্নরকম এক লড়াই। উকিলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, তার বাঁকা কথা, ফিরিয়ে দেয়া, পথিমধ্যে কামাল পাশা নামক কুৎসিত এক লোকের সাক্ষাৎ, সরল মায়ের নরম আচরণ এবং এদিকে পরীক্ষার দিনও ঘনিয়ে আসে। হঠাৎ ঝড়ের রাতে দুশ্চিন্তায় পড়ে মা-মেয়ে। আগের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে লায়লা বানু চোখের জল মুছে এবং আপন মনে বলে ওঠে, জগতে এমন কিছু কান্না আছে, যার ভাগ কাউকে দিতে হয় না। কিছু কান্না নিজের। কিছু কান্না একান্ত গোপন উকিলের ফি দিতে, সংসারের শেষ সম্পদ মায়ের সোনার দুল বিক্রি করে সরল মনে কামাল পাশার ঠিকানায় গেলে বুঝতে পারে শশী এক ছদ্মবেশী জানোয়ারের ভোগ্যবস্তুর শিকার হতে যাচ্ছে, এই কুলাঙ্গারের ফাঁদে আটকে গেছে সে। নির্মম এই মুহুর্তে হঠাৎ আগন্তুক এক ছেলে, আবিদের আবির্ভাবে রক্ষা পায় শশী। নির্মম, নৃশংস এই পরিস্থিতি শশী কারোর সাথেই ভাগাভাগি করতে পারে না। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর মোক্তার মিয়ার জামিন হলেও সেই রাতে তার আকস্মিক মৃত্যুতে মা-মেয়ে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরে। জীবনে দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই এর পর যখন এক ঝলক আলোর কিরণ দেখা যায়, সেটুকুও নিভে গেলে যে কি পরিস্থিতির তৈরী হয় তা চন্দ্রলেখা উপন্যাস পড়লে সুস্পষ্ট বুঝা যায়। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় এমতাবস্থায় মতিনের আকস্মিক উপস্থিতিতে বিরক্ত হয় শশী। যেখানে নিজেদেরই ভাত যোগানো দায়, সেখানে উটকো ঝামেলা আবার মতিনের থাকা-খাওয়া। এদিকে ভিন্ন এক চরিত্র জামিল ভাইয়ের উদয় ঘটে। তিনি ব্যানার, লিফলেট ইত্যাদি তৈরী করেন। তার সাথে কথা বললে শশী যেন মনে উৎসাহ, মনোবল পায় যা তাকে জীবনের কঠিন রাস্তা সহজেই হাঁটতে সহায়তা করে। জামিলের প্রতি ভালো লাগা থেকেই শশী এক সময় দূর্বল হয়ে পরে তার প্রতি। ভালোবাসার শীতল হাওয়া যেন দোলা দেয় মনে। শশী তার সংগ্রামী জীবনে নানা চড়াই-উৎরাই এর মধ্যে দিয়ে সময় পার করতে থাকে। দীর্ঘদিন পর চেয়ারম্যান এর ভাই গ্রামে ফিরে অর্ধেকেরও কম বয়সী শশীকে দেখে পছন্দ করে। একপর্যায়ে ভাইয়ের কথায় বাধ্য হয়ে চেয়ারম্যান তার দুশ্চরিত্র, খুনি, জঘন্য ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে শশীর বিয়ের প্রস্তাব দেন লায়লা বানুকে। যার সঙ্গেই কি না প্রথমে লায়লা বানুর বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। চেয়ারম্যানকে লায়লা বানু শক্ত এবং কড়া কথা শোনালে তিনি ক্ষমতা আর মর্যাদা হারানোর ভয়ে আঁতকে ওঠে। এরপর তালেবের কটু কথায় মতিনের একেবারে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে মন খারাপ হয়ে যায় মা-মেয়ের। ওদিকে শশীকে বিয়ে করার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার ক্ষোভে চেয়ারম্যান ও তার ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব খানিকটা বেঁধেই যায়। অবশেষে মেডিকেল পরীক্ষার দিন এলো। সেদিন জামিল ভাইয়ের থেকে পেইন্টিং উপহার পেয়ে শশী ভীষণ খুশি হয় এবং নিজের হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখতে পায় সেখানে। প্রতিবার শশী যখন চরম কোনো বিপদে পড়ে, তখনই দেবদূতের মতো আবিদ সাহায্য করতে হাজির হয়। পরীক্ষার দিনও হল রুম খুঁজে দিয়ে আবার সাহায্য করে আবিদ। পরীক্ষা শেষে আবিদের সাথে কথা বলতে অনেকটা সময় চলে যায় শশীর। ওদিকে বাড়িতে, মতিনের মাদরাসায় কাটানো নির্মম জীবনকাহিনী শুনতে শুনতে মমতাময়ী, মাতৃরূপে লায়লা বানু আবেগী হয়ে খানিক স্নেহের পরশ দিতেই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে স্নেহাশিস মতিনকে। তালেবের মত দুষ্টচরিত্র, কুশ্রী মানুষদের জন্যই সমাজে অতিসাধারণ মানুষের জীবন কী নির্মমভাবে বিষিয়ে যায়... যার প্রমাণ মেলে উপন্যাসের এই পর্যায়ে এসে। কিন্তু, সত্যরে করিবে অবরুদ্ধ, কার আছে এ সাধ্যি। সহজ-সরল বেশধারী চেয়ারম্যান এবং তার অনুসারী তালেব যখন মিথ্যে অপবাদে মতিন ও লায়লা বানু এবং শশীর উপর অত্যাচার করে ঠিক সেই সময় জামিল ভাই সাজু সরকারকে সঙ্গে নিয়ে রক্ষা করতে উপস্থিত হয় ঘটনাস্থলে। শশীরা রক্ষা পেলেও পরে চক্রান্তকারীর জালে ফেঁসে যায় প্রিয় জামিল ভাই। মিথ্যে অভিযোগে জামিলকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে কাশেম জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শশী ও তার মা কে মোক্তার মিয়ার জীবন নাশের সব ইতিহাস খুলে বলে, নিজে অনুতপ্ত বোধ করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদের কাছে। নিথর হয়ে নির্লিপ্ত চাহনিতে চেয়ে থাকে মা-মেয়ে। প্রিয় জামিল ভাই কে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা এবং নন্দনপুরের রক্তাক্ত ইতিহাস শশী বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে, পত্রিকা অফিসে চিঠি লিখে পাঠায়। এর মধ্যেই মতিন যেমন হঠাৎই চলে আসে তেমনই হঠাৎই কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে চেয়ারম্যান এর সকল কুকীর্তি ফাঁস হয় এলাকাবাসীর কাছে, অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে নৃশংস মৃত্যু হয় তালেবের, ক্রসফায়ারে নিহত হয় মোতা খান, জনগণের ক্ষোভে, তাদের রাগান্বিত বিস্ফোরণে বেগতিক অবস্থা দেখে স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যায় প্রভাবশালী সেই ভদ্ররূপী শয়তান। বদলে যায় নন্দনপুর এবং এই এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। দেখা যায় শান্তির ঝলক এই গ্রামে। বিশদ এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শশী ও তার গোটা পরিবার। যে মানুষটার প্রতি মনের কোণে সুপ্ত এক অনূভুতি কাজ করে, যার কথায় মনে অদম্য শক্তি পায় শশী, নুইয়ে পড়া মনোবল বাড়িয়ে দেয় এক মুহুর্তেই, সেই মানুষটা রয়েছে জেলে। কষ্ট হয় শশীর। এদিকে আবিদের মতো শুদ্ধ ও সাহায্যকারী মানুষও শশীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আবিদ নিরবধি শশীকে জানায়, শশী তাকে পাশে না রাখলেও সে সর্বদা থাকবে। কারণ প্রকৃতিই যে চায় আবিদ পাশে থাকুক শশীর। কিন্তু শশী আবিদের মনের কথা বুঝে বলে, শশী চায় না তার প্রিয় মানুষগুলা চাঁদের খুব কাছে এসে ডুবে যাক। মানে তার প্রিয় মানুষ গভীর অতলে প্লাবিত হোক, হারিয়ে যাক, কোনো ক্ষতি হোক তা সে চায় না। এজন্যই দূরত্ব বজায় রাখে। কিন্তু আবিদ এক পৃথিবী বাসনা মনে পুষে রাখলেও শশী আর ফিরে তাকায় না। চলে যায় বিধ্বস্ত মা, ছোট ভাই হাবু আর বিপদগ্রস্ত প্রিয় জামিল ভাইয়ের জামিনের উদ্দেশ্য জীবন যুদ্ধের নতুন এক অধ্যায়ে..... চন্দ্রলেখা থেকে মূল শিক্ষনীয় বিষয় হলো, জীবনের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে চরম বিপদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এগুলোকে শক্ত ভিত করে জীবনযুদ্ধের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে সত্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে আমৃত্যু। উপন্যাসটি এতই মন ছুঁয়ে গেছে যে পড়া শেষ করেও যেন কয়েকদিন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। প্রিয় উক্তিঃ ১. কারো চোখে চোখ রেখে মিছে সান্ত্বনা দেওয়া কঠিন। ২. কান্না এমনই এক শক্তিশালী অভিব্যক্তি মুহুর্তেই যে কারো মন আর্দ্র করে দেয়। ৩. অতি আপন মানুষের কাছে এলে অজস্র কথা একসঙ্গে যেন বের হয়ে আসতে চায়। একটার সঙ্গে আরেকটা পেঁচিয়ে শেষ পর্যন্ত আর কথাই বের হয় না। ৪. প্রচন্ড ঝড়ের রাইতে সেই গাছটাই উপড়ায় পড়ে, যে গাছ মাটি কামড়ায়া থাকতে পারে না। কিন্তু যে গাছটা বাতাসের প্রবল বেগেও মাটি কামড়ায় টিকে থাকতে পারে, তার হয়তো দুই-চারটা ডাল ভাঙে, পাতা ঝরে, গাছটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত মরে না। বছর না ঘুরতেই দেখবা নতুন নতুন ডাল গজায়, কচি পাতা গজায়। ৫. পৃথিবীতে নীরব কান্নার চেয়ে তীব্র কষ্টের, ভয়ানক যন্ত্রণার বুঝি আর কিছু নেই। ৬. মানুষের জীবন আর জটিলতা হইল পিঠাপিঠি ভাই। কেউ কাউরে ছাইড়া যেমন যাবে না, তেমনি সহ্যও করবে না। ফলে জীবনে জটিলতা থাকবেই। ৭. অভাবের হাহাকার যদিও-বা গোপন করা যায়, অর্থের বা ক্ষমতার উচ্ছ্বাস মানুষ গোপন রাখতে পারে না।

Mahia Akter
Mahia Akter ভেরিফাইড
29 Jun 2023

#ইমরানেরগল্পকথাবুকরিভিউপ্রতিযোগিতা চন্দ্রলেখা: জীবন কিংবা ঘাত-প্রতিঘাতের বক্ররেখা সারসংক্ষেপ: উপন্যাসের শুরু করাতকল শ্রমিক মোক্তার মিয়াকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে। সেখান থেকেই আমরা দেখতে পাই আঠারোবাঁকি নদীর তীর ঘেষা নন্দনপুর গ্রামের মোক্তার মিয়ার পরিবারটিকে। স্ত্রী লায়লা, মেয়ে শশী আর ছেলে হাবুকে নিয়ে দারিদ্র্যের সাথে দ্রোহ করতে থাকা পরিবার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের পরিবারে নেমে আসে অর্থনৈতিক দুর্দশা, একই সাথে নানা সামাজিক সমস্যাও। নিজ গাঁয়ে তো বটেই, আশেপাশের গ্রামেও মোক্তার মিয়াকে সবাই ভালো মানুষ হিসেবেই জানে। অথচ, সর্বহারা পার্টির এক সক্রিয় সদস্য, যে কিনা ধরা পড়েছে ডাকাতির অভিযোগে, সেই কাশেম নামক ব্যক্তিই পুলিশকে জানিয়েছে মোক্তার মিয়ার ডাকাতির সাথে সম্পৃক্ততার কথা! পুলিশের কাছ থেকে এহেন তথ্য পেয়েও বিশ্বাস হয় না এইচএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে শশী কিংবা গ্রামের চেয়ারম্যান আতাহার খানেরও। কিন্তু তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে তো আর পুলিশ কিংবা আদালত চলে না। তাই সহসাই মোক্তার মিয়াকে মুক্ত করার কোনো পথ খুঁজে পায় না তার পরিবার। বিপদগ্রস্থ পরিবারটিকে তখন কেউ কেউ সত্যিই সাহায্য করতে চায়, আবার কেউ বিপদের ফায়দা লুটতে হয় তৎপর। তবুও কি শেষমেশ মুক্তি পায় মোক্তার মিয়া? তার পরিবারে কি আবারো ফিরে আসে দারিদ্রঘেষা ক্লান্ত হাসিমুখের আবেশটুকু? ডাকাতির সাথে সম্পৃক্ততার ঘটনাটি কি আসলেই সত্য? নাকি এর মাঝে লুকিয়ে আছে আরো নির্মম কোনো রহস্য? সব প্রশ্নের উত্তর ধাপে ধাপে খুলতে থাকে অধ্যায়ের পর অধ্যায়ে, শব্দের বুননে। চরিত্রের চিত্রায়ণ: গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ও অগুরুত্বপূর্ণ মিলিয়ে অনেক চরিত্রের আগমন ঘটেছে। গল্পের পরিস্থিতি ও গভীরতা অনুযায়ী সেইসব চরিত্রের রূপ ফুটে উঠেছে ক্যানভাসে আঁকা চৌকস শিল্পীর চিত্রকর্মের মতোই। একাধিক শক্তিশালী চরিত্রের ভিড়েও বইয়ের মুখ্য চরিত্র শশী। কখনো কোমল, কখনো স্পষ্টভাষী, কখনো বা দুর্বল, মেধাবী ও রূপবতী এই চরিত্রটিকে ভালো না লাগার কোনো কারণ নেই। তবুও লেখকের প্রগাঢ় যত্নই যেন এই চরিত্রটিকে আরো শক্তিশালী ও ভয়ংকর কিন্তু মায়াবী করে তুলেছে! শশীর চরিত্রের প্রধান দিকটিই হচ্ছে তার বাস্তবতাবোধ। যার প্রমাণ আমরা উপন্যাসের শুরুর দিকেই পাই, যখন মোক্তার আলীকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে সে ঠাণ্ডা মাথায় কথোপকথন চালিয়ে যায় ও দারুণ বুদ্ধিমত্তার সাথে আগত ঘটনাক্রমকে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে থাকে। কিন্তু নারীর স্বভাবজাত দুর্বলতাকেও লেখক ফুটিয়ে তুলতে ভোলেননি। নির্মম এক ঘটনার অবতারণা তাই পাঠক হৃদয়কে দগ্ধ করে ঠিকই, তবে সেই ঘটনাকে পেছনে ফেলে শশীর বীরদর্পে সামনে এগিয়ে যাওয়াই যেন তার চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটিকে ইঙ্গিত করে। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্রগুলোর গুরুত্ব থাকলেও, গল্পের গভীরতা অনুযায়ী শশী চরিত্রটির কাছে তারা কেউই মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি। তবে স্বমহিমায় আলো ছড়িয়েছে জামিল রায়হান, লায়লা, মতিন ও শেষদিকে খুব অল্প কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাওয়া সাজু সরকারও। উপন্যাসে গল্পের পট পরিবর্তন অনুযায়ী লায়লা চরিত্রটির চিত্রায়ণ হয়েছে অসাধারণ। একই অঙ্গে তার কত রূপ! সে একই সাথে মমতাময়ী মা, প্রেমময়ী স্ত্রী, অগ্নিমূর্তি অশুভ বিনাশিনী। অথচ, গল্পের শুরুতে তাকেই মনে হচ্ছিল অতি সাধারণ এক গ্রাম্য বধূ মাত্র! জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত যে একই মানুষকে একাধিক রূপে পরিবর্তিত করতে পারে, তারই প্রমাণ আমরা দেখেছি লায়লা চরিত্রটির মাঝে। আর সেকারণেই সে স্বামীর মুক্তির আশায় জ্ঞানশূন্যের মতো আচরণ করে, আবার পরিবারের আসন্ন বিপদ উপলধ্বি করে সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে আসীন মানুষের বিপক্ষে জোর গলায় কথা বলতেও পিছ পা হয় না। গল্পের ক্রম অনুযায়ী চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ যদি করতে যাই সেক্ষেত্রে, আতাহার চেয়ারম্যান চরিত্রটি উপন্যাসের সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক একটি চরিত্র। বহুকাল পুরনো পাণ্ডুলিপি যেভাবে প্যাপিরাসে মোড়ানো থাকত, তেমনি মানব চরিত্রের বহু দিক লুকিয়ে ছিল তার মধ্যে। গল্পের একেক ভাঁজে যেন উন্মোচিত হয়েছে তার একেক রূপ! বাস্তবতার সাথে সাদৃশ্য রেখে এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের রূপায়ন করার জন্য লেখক একটি বড়সড় ধন্যবাদ পেতেই পারেন! জামিল রায়হান, মতিন কিংবা আবিদ চরিত্রগুলোর আগমন যেন চৈত্র‍্যের কাঠ ফাটা রোদে বহু প্রত্যাশিত এক গ্লাস বরফগলা ঠাণ্ডা পানির মতো! তালেব কিংবা কামাল পাশার মতো অন্ধকারের বিরুদ্ধে মশালের রক্তিম আলো জ্বালতেই যেন তাদের উদয়। এছাড়াও গল্পের প্রয়োজনে আসা অন্যান্য চরিত্রের ডিটেইলিংয়েও লেখক কোনো কার্পণ্য করেননি। বরং গভীর মমতায় যেন শব্দের আঁচড়ে জীবন্ত করে তুলেছেন একেকটি চরিত্রকে। আলোচনা - সমালোচনা - পর্যালোচনা: যেকোনো ফিকশন আমি কখনো শিক্ষা বা মেসেজের জন্য পড়ি না। বাস্তবতার সাথে সাদৃশ্য থাকতে হবে কিংবা সমাজের ভালো-মন্দ উপস্থাপন করতেই হবে এমনটাও আশা করি না। তবুও আমি সবসময়ই মনে করি, একজন লেখকের তার সময়ের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা থাকে। আজ থেকে বহুবছর পর যে প্রজন্ম পৃথিবী দেখবে, আজকের সমাজের গল্পটা তারা জানবে কিন্তু ফিকশনের ওপর ভর করেই। তাই একজন ভালো লেখকের উচিৎ তার গল্পে বর্তমান সময়কে যতটা সম্ভব সঠিকভাবে বন্দী করা। আর এখানেই আমাকে মুগ্ধ করেছেন লেখক আবদুল্লাহ আল ইমরান। একজন শক্তিশালী লেখকের মতো শুধু মূল প্লটেই গল্পকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং বাড়ির উঠোনে লাগানো লাউয়ের ডগার মতো গল্পটিকে বাড়তে দিয়েছেন, দিয়েছেন ইচ্ছেমতো এদিক-সেদিক শাখা মেলার সুযোগ। আর তারই হাত ধরে গল্পে উঠে এসেছে বর্তমান সময়ের নানান রূঢ় বাস্তবতা। যা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদক্ষেপ। বইয়ের গল্পটিকে যদি একবাক্যে সংক্ষেপিত করতে চাই তবে বলতে হবে, একটি বিপদগ্রস্ত পরিবারের গল্প ও সেখান থেকে তাদের উত্থান। স্বাভাবিকভাবেই এই গল্পে তাই চলে এসেছে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেউ, আবার সেই বিপদের আগুনে আরেকটু ঘি ঢেলে দেয়া কেউ কেউ। শশীর মতো বুদ্ধিমতী চরিত্রকেও আমরা দেখেছি বিভ্রান্ত হতে। বিপদে কখনো মানুষের বুদ্ধিমত্তাও যে স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না সেটাই যেন তার প্রমাণ। উপন্যাসের শুরু থেকেই যে পরিবারটির বিপদের যাত্রা শুরু হতে আমরা দেখেছি, তাদেরই কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতেও দেখেছি। এটা লেখকের চমৎকার বাস্তবতাবোধকে চিহ্নিত করে। কারণ, ব্যক্তিজীবনেও আমরা কিন্তু একটা দুঃখকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তের চারপাশে দুঃখী বেড়ালের মতো ঘুরতে পারি না। যত নির্মমই হোক, এক সময় সেই দুঃখকে পেছনে ফেলে আমাদেএ এগিয়ে যেতে হয়। আবার, তারমানে এই না যে জীবন একটি ধনাত্মক ঢালবিশিষ্ট সরলরেখা! বরং, আমাদের জীবনটা যেন ক্রমশ উঁচুনিচু এক বক্ররেখার মতো৷ উপরে উঠুক বা নিচেই নামতে থাকুক, সেটা অনন্তকাল চলতে থাকে না। এই প্রসঙ্গে উপন্যাসে জামিল রায়হানের বলা একটি কথা আমার বেশ ভালো লেগেছে, ‘জীবন আসলে কোনো সরলরেখা না। সব সময় সোজা পথে চলেও না জীবন। কারণ, তোমার চেনা পথের বাইরেও অসংখ্য পথ আছে। সেই সব পথ আবিষ্কারে আনন্দও আছে। হুট কইরা অচেনা কোনো পথে ঢুইকা পইড়া আনন্দ না পাও, দুঃখ পাইও না। মনে রাখবা, চেনা পথের বাইরে আর সব পথরে ভুল বলার সুযোগ নাই।' এই উপন্যাসের আরেকটি চমৎকার দিক ছিল বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক চিত্র ফুটিয়ে তোলা। গল্পের একদম শুরু থেকেই আতাহার চেয়ারম্যানের সংশ্লিষ্টতা এই বোঝাপড়াটিকে সহজ করে দিয়েছে৷ পুরো দেশের সাধারণ মানুষের ওপর রাজনৈতিক বা ক্ষমতাসীনদের প্রভাব কেমন সেটা ভালোভাবে বুঝতে চাইলে একদম ক্ষুদ্র পরিসর থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করতে হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ এই গল্পে আতাহার চেয়ারম্যানের প্রভাবই পাঠককে বুঝতে সাহায্য করেছে যে সাধারণ নাগরিক ক্ষমতাসীনদের কাছে কতটা অসহায়! এই ক্ষমতাসীনদের বন্ধু হওয়াও যেমন সুখকর নয়, আর শত্রু হওয়া মানে তো জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনা। তবে, লেখক কেবল অন্ধকার হাতড়ে সমস্যাকেই তুলে ধরেছেন এমনও নয়। আলোর পথও দেখিয়েছেন। বিপদ যখন অক্টোপাসের মতো আষ্ঠেপৃষ্ঠে জাপটে ধরছিল, সেখান থেকেই তিনি আলো বের করে এনেছেন। বাস্তব জীবনেও আমরা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো বিপ্লব ঘটতে দেখি তখনও একটা জিনিস লক্ষ্য করি যে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যেতে যেতে এক পর্যায়ে খুব ক্ষুদ্র কোনো ঘটনাই এক বড় বিপ্লবের জন্ম দেয়৷ উপন্যাসে আতাহার চেয়ারম্যানের পতনটাও কিন্তু সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমরা একদম ক্ষুদ্র পরিসরে হয়তো শশীদের পরিবারের ভাঙনের সুরটুকু দেখি, কিন্তু এই সুরকে কেন্দ্র করে রচিত বিপ্লবই কিন্তু বদলে দেয় পুরো গ্রামটির সামাজিক ও রাজনৈতিক গতিপথ। একই সাথে, আরেকটি মজার বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন তালেবের চরিত্রের মাধ্যমে। ক্ষমতাসীনদের পদলেহন করে যারা মাতামাতি করতে থাকে, ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর সেইসব ক্ষমতাসীনরা কোনোমতে পার পেয়ে গেলেও, ওই চামচারাই কিন্তু প্রথম আক্রোশের শিকার হয়! আবদুল্লাহ আল ইমরানের লেখার যে দিকটি আমার বিশেষ পছন্দের সেটি হচ্ছে, তিনি প্রধান গল্পের সাথে একেকটা বিচ্ছিন্ন অংশ জোড়া দেন, যার মাধ্যমে আমাদের সমাজের চিত্র খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। মতিন চরিত্রটি যখন হুট করে গল্পে চলে আসে, তখন আমি খানিকটা বিরক্তই হয়েছিলাম। কিন্তু সেই চরিত্র তার সাথে করে যে গল্পটি আনে, তা আমাকে স্তব্ধ করে দেয়৷ মাদ্রাসা মসজিদ বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন বর্তমানে অনেক চোখে পড়ছে, প্রায়ই মিডিয়ায় ভেসে আসছে এসব খবর। সংবেদনশীল এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর লেখালেখি যে হচ্ছে তা কিন্তু না। ফিকশনে সম্ভবত এই প্রথম কেউ ব্যাপারটা তুলে ধরল। উপন্যাসে দুর্বলতার জায়গা যদি চিহ্নিত করি, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে উপস্থাপন ও বর্ণনাভঙ্গিতে লেখক যেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তার অনেকটাই যেন অনুপস্থিত ছিল সংলাপ রচনার ক্ষেত্রে। গ্রামীণ পরিবেশের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসের চরিত্ররা প্রায়শই প্রমিত উচ্চারণে কথা বলছে এমনটা বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। এমনকি কিছু কিছু সংলাপে কথ্যরূপে অপ্রচলিত শব্দ দেখা গেছে। যেমন একটি সংলাপে 'পিতা' শব্দটির ব্যবহার ছিল। কিন্তু আমরা সাধারণ কথাবার্তায় 'পিতা' না বলে 'বাবা' বলে থাকি। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যেটি চোখে পড়েছে সেটি হচ্ছে, ১৩৬ পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন, "সাজু সরকার যেদিন মারা যায়, সেদিনই বৃত্তি পরীক্ষার ফল বের হয়েছিল শশীর।" অথচ উপন্যাসের শেষাংশে সাজু সরকার নামের এক চরিত্রের বেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আমরা দেখেছি। সম্ভবত লেখক সাজু সরকার নামে দুজন আলাদা ব্যক্তিকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন অথবা ১৩৬ পৃষ্ঠায় আসা ব্যক্তির নাম হয়তো ভুল হয়েছে৷ আশা করি লেখক এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে দেখবেন। পরিশেষ - নিঃশেষ: জীবন, আঠারোবাঁকি নদীর মতো বয়ে চলে। পাড়ে থাকা শশী, লায়লা, মোক্তার মিয়া, আতাহার-মোতাহার খান, সবার গল্পই চলতে চলতে একদিন শেষ হয়ে যায়। মুছে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ায়। নদীর স্রোতকে যেমন একটা থেকে আরেকটা আলাদা করা যায় না, সব মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে, তেমনি উপন্যাসের গল্পও কেবল এক জীবনের নয়। টুকরো টুকরো করে জোড়া দেয় অনেকগুলো জীবন, বহমান সময় আর বাস্তবতাকে। কাগজের পাতায় চিত্র আঁকা এই জীবনের কারিগর আবদুল্লাহ আল ইমরানকে ধন্যবাদ, আপনার জুড়ে দেয়া গল্প আমার মানসপটে রেখাপাত করেছে! বই: চন্দ্রলেখা লেখক: আবদুল্লাহ আল ইমরান প্রকাশনী: অন্বেষা রিভিউদাতা: মাহিয়া আক্তার

Mursalin Manon
Mursalin Manon ভেরিফাইড
26 Jun 2023

দুই নারীর জীবন সংগ্রামের মানসপটের আরেক নাম "চন্দ্রলেখা" আমি কথাসাহিত্যিক আবদুল্লাহ আল ইমরানের সাহিত্যকর্মের একজন অনুরাগী। একজন কথাশিল্পী জীবনকে তাঁর সমগ্রতা দিয়ে মানুষ ও সমাজের মধ্যে উপলব্ধি করেন। কথাশিল্পী একজন চিত্রকরও বটে, তাঁর বিশাল ক্যানভাসে ফুটে ওঠে মানুষের ও সমাজের বিচিত্র সব চিত্র। সেই অর্থে বলতে পারি তিনি একজন শিল্পী। জনপদের শিল্পী। ছবি আঁকেন তবে রং-তুলিতে নয় তার কলমে, তার লেখনীতে। আমি তার বই পড়তে বসলে যেন একটা জনপদকেই দেখতে পাই। 'চন্দ্রলেখা'-ও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি এবারও খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন স্রোতস্বিনী আঠারোবাঁকি নদীকে, নদীর দুপাশে গড়ে ওঠা জনপদকে। নদীর এক দিকে নন্দনপুর, আরেক দিকে আলিয়াপুর। কিন্তু আপন মনে নদীর এই খেলা আর অপরুপ সৌন্দর্য দেখার সময় নেই নন্দনপুরের খেটে খাওয়া জীবন যুদ্ধে সংগ্রামী এইসব মানুষদের। জোয়ার-ভাটার মধ্যে বেড়ে ওঠা সেই অঞ্চলের মেয়ে শশী। গাঁও-গ্রামের মানুষের মধ্যে মেয়ে সন্তান নিয়ে একটা ভ্রান্ত ধারণা থাকলেও তা শশীর দাদার মধ্যে ছিলো না। চাঁদের মত সুন্দর হয়েছে বলে নাম রেখেছিলেন 'শশী'। কিন্তু আদর করে ডাকতেন চন্দ্র বলে। এখন আর দাদা নেই পরিবারে বাবা মোক্তার মিয়া, মা লায়লা বানু, ছোট ভাই হাবু আর আমাদের এ উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু শশী। জীবনটা বেশ ভালোই চলছিল তাদের। হঠাৎই মোক্তার মিয়াকে খুন ও লুটতরাজের অভিযোগে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়ে ওদের মাথার উপর। থানায় একনজর দেখার জন্য পরে থাকে শশী, লায়লা বানু ও হাবু। কিন্তু দেখা পায় না। কষ্ট বাড়ে। দুর্দিনে পাশে দাঁড়ান আতাহার চেয়ারম্যান। তিন বারের চেয়ারম্যান, অনেক জানাশুনা তার। উকিল, পুলিশ, কোর্ট-কাচারী দৌড়াদৌড়ি করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠে শশী। এদিকে ওর কয়েক মাস পরেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে কই? উকিলের পিছনে ছুটতে ছুটতে দেখা হয় উকিলের সহযোগী কামাল পাশার সাথে। বদ লোক এই কামাল, এক বিভৎস দিনের সাক্ষী হতে হয় শশীকে। আরও বিভৎস হতে পারতো যদি দূত হিসেবে আবিদের মত ছেলেকে সৃষ্টিকর্তা না পাঠাত। কেটে যায় মাসের পর মাস। অনাহারে দিন কাটে ওদের। এরই মধ্যে শশীর পরীক্ষা শেষ হয়। সবক্ষেত্রেই মাথার ওপরে ছায়ার মত ছিলেন আতাহার চেয়ারম্যান। প্রায় আট মাস পর শশীর ফলাফল বের হওয়ার আগের দিন ছাড়া পায় মোক্তার মিয়া। এতদিনের কষ্ট ভুলে উচ্ছ্বাসের শেষ থাকে না শশী সহ সবার। মোক্তার মিয়ার পছন্দের সব খাবার রান্না করে লায়লা বানু। পরিবারে আনন্দ ফিরে আসে। পরদিন সকালে মোক্তার মিয়ার লাশ পাওয়া যায় করাতকলে। আনন্দ ছিলো বুঝি শুধুই ক্ষণিকের। বিষাদ নেমে আসে গোটা পরিবারসহ পুরো গ্রামে। কারণ গ্রামের মধ্যে ভালো মনের একজন মানুষ হিসেবে বেশ সুনাম ছিলো মোক্তার মিয়ার। শশীর ফল বের হয়, বোর্ড স্ট্যান্ড করে সে। তখন ভালো খবরটাও আর ভালো থাকে না। শুরু হয় শশীদের জীবন সংগ্রাম। আতাহার চেয়ারম্যানের ডান হাত তালেব আলি। চেয়ারম্যানের সব অপকর্মের সাক্ষী। এ জাতীয় লোক গ্রামে থাকে বলেই শশীদের পারিবারের মত আর পাঁচটা পরিবার বিপর্যস্ত হয়, ভোগে চরম অশান্তিতে। তালেব অনেকদিন থেকেই পছন্দ করে শশীকে কিন্তু শশীর কাছ থেকে পাত্তা পায় না কখনোই। মোক্তার মিয়া মারা যাবার পর থেকে এ বাড়ি কর্তাশূণ্য। বলতে গেলে হাবু নিতান্তই শিশু, তাই কর্তাশূন্য বলার চেয়ে একবারে পূরুষশূণ্য বলাটাই ভালো। পুরুষশূণ্য সেই বাড়িতে হঠাৎই প্রবল অসুস্থতা নিয়ে একদিন আসে মতিন। প্রথমদিকে নিজের নাম, ঠিকানা মোটকথা তেমন কিছুই মনে করতে পারে না সে। লায়লা বানুর প্রচেষ্টায়, শশীর সহযোগিতার ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে মতিন। হয়ে ওঠে পরিবারের একজন। লায়লা বানুকে পেয়ে মায়ের ভালোবাসায় পরিতৃপ্ত হতে থাকে সে। হাবুর সাথেও বেশ সুক্ষতা গড়ে ওঠে তার। শশীর প্রথম প্রথম অপছন্দ হলেও এখন বেশ ভালই লাগে মতিনকে। মাদরাসায় পড়ুয়া মতিন, কালেম প্রকৃতির মানুষ না হলেও কিছু অলৌকিক ক্ষমতা তার হয়তো আছে। এমনটাই মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করে লায়লা। পূত্রসম মতিনের প্রতি ভালোবাসা ছাড়িয়ে লায়লার এখন অগাধ বিশ্বাস আর ভক্তি। তার সহায়তায় লায়লা বানু যে এখন স্বপ্নে তার স্বামীকেও দেখতে পায়, মনের দুঃখগুলোকে ভাগ করে নিতে পারে। এক কথায় মতিন এখন যেন তার নয়নের মণি। জীবন যুদ্ধে দুই সংগ্রামী নারী শশী ও লায়লা, যত যা কিছুই হয়ে যাক না কেন বাঁচতে তো হবেই! শশীর নানা বাড়ী রায়পুরাতে গিয়ে যে উঠবে সে অবস্থাও যে নেই। তাদেরও সে আগের অবস্থা এখন আর নেই। এ বাঁচার তাগিদ থেকেই লোন নিয়ে মুরগীর খামার করে। দেখাশুনা করে মতিনও। মা ও মেয়ের মধ্যে কথা হলে খুব একটা যে সুখকর সময় কাটে তা না, তারপরও একে অপরের অবলম্বন। মনের দুঃখগুলো না বলে থাকতে পারা যায় না। তাদের বাঁচার লড়াই যেন এক সুতোয় গাঁথা। লেখাপড়া থেমে নেই শশীর। সামনে মেডিকেল পরীক্ষা। দোয়া নিতে যায় মিতা আর্ট ঘরের কর্ণধার জামিল রায়হানের কাছে। শশীর জামিল ভাই। তিন কুলে কেউ নেই, সরকার বাড়ীতেই জামিলের বাস। বয়সে অনেকটা বড় হলে কি হবে বলতে গেলে শশীর একমাত্র দুঃখ গোছার আশ্রয়। যার কাছে জীবনের দু'টো কথা বলা যায়, ভাগ করে নেওয়া যায় সুখ-দুঃখ। স্নেহ আর ভালোবাসার টানে তাদের সম্পর্কটা খুব মধুর। এই মধুরতা ছাড়িয়ে অন্যকিছু কি ভাবতে চায় শশী? না ঠিক হবে না বোধহয়? ভাবনায় ডুবতে থাকে শশী ও লায়লা বানু। এমনই এক সময়ে বাড়িতে আসে বয়োজ্যেষ্ঠ ফোরকান গাজী। তার ভাষ্যমতে মোক্তার মিয়ার জানাজায় অনেক বছর পরে দেখা যায় মোতা খানকে। চেয়ারম্যান আতাহার খানের ছোট ভাই মোতাহার খান। অনেকগুলো রহস্যের জট খুলতে থাকে ধীরে ধীরে। তার মনে গুপ্ত কষ্ট নাড়া দিয়ে ওঠে, ছেলে কাওসার হারানোর শোক। উঠে আসে অনেকগুলো নাম। শশী জানতে পারে খতম পার্টি, গুপ্ত পার্টি সম্পর্কেও। সূত্র গুলো দলা পাকিয়ে যাচ্ছে বারবার। শশী ও তার পরিবার চরম বিপাকে পড়ে। ওদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে স্বার্থান্বেষী মহল। নানান কুপ্রস্তাব আসতে থাকে নানান দিক থেকে। হাল ছাড়ে না ওরা, জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে যায় না। ওদের পাশে এসে দাঁড়ায় সাজু সরকার, জামিল রায়হান, ফোরকান গাজীর মতো লোকেরা। আর সার্বক্ষনিক সঙ্গী মতিন তো আছেই। কোনো এক মুহুর্তে শশী আবারও দেখা পায় আবিদের। বন্ধুত্ব হয়, কথা বলার মত নিজের বলতে একজন মানুষ পায় শশী। কিন্তু শশী তার জীবনযুদ্ধে অন্য কাউকে জড়াতে পারে কি? অন্য কিছু ভাববার সময় আছে কি শশীর? কিছুদিনের মধ্যে এই অপরূপ নন্দনপুর রূপ নেয় রক্তগঙ্গায়। ওপর মহলের নজর পরে। খুলে যায় সব রহস্যের জট। থেমে থাকে না দুই নারীর জীবনযুদ্ধ। ছুটে চলে তাদের নিরন্তর পথচলা। ভালোলাগার মতো লাইনগুলো : * মানুষের জীবন আর জটিলতা হইল পিঠাপিঠি ভাই। কেউ কাউরে ছাড়া যেমন যাবে না, তেমনি সহ্যও করবে না। * মৃত্যু মানেই জীবনের অমোঘ সত্যের মুখোমুখি হওয়া। ভুলে থাকা চুড়ান্ত পরিণতি ভেবে স্রষ্টার কাছে নতজানু হওয়া। * কান্না এমনই শক্তিশালী এক অভিব্যক্তি, মুহূর্তেই যে কারও মন আর্দ্র করে দেয়, হোক সে যতই শক্ত মনের মানুষ। নিজস্ব অভিব্যক্তি : কঠিন সব জীবন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে মানুষ। লায়লা বানু, শশী, হাবু, মোক্তার মিয়া, ফোরকান গাজীর মত হয়তো কখনও কখনও জীবনের এই অমোঘ নিয়মের বাইরে আমিও নই, আপনিও নন। যদিও জীবন যুদ্ধের রূপ ভিন্ন তবুও আমায় স্পর্শ করেছে এই দুই নারীর জীবন যুদ্ধের গল্প। কিছু মানুষের মনের সব জটিলতা আর দুই নারীর সংগ্রামকে খুব সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন লেখক। মাদরাসার মধ্য চলতে থাকা অরাজকতা, নীতি বিরুদ্ধ কিছু বিষয় যা আমরা দেখতে পাই। সৃষ্টিকর্তার ঘরে চলে তারই বিরুদ্ধ কাজ। যা আমাদেরকে ব্যথিত করে। ছোট ভাই হাবুকে খুব একটা সময় দিতে পারে না শশী। তারপর যেটুকু সময় দিতে পেরেছে তার মধ্যে আমি যেন 'পথের প্যাচালী'-এর অপু-দূর্গার ছাপ দেখতে পাই। সমাজের মুখোশ পড়া মানুষগুলোকে আমরা যেন চিনতে পারি এজন্যই লেখক হয়তো দেখিয়েছেন আতাহার খান, তালেব আলী, মোতা খানের মতো লোকদেরকে। এরাই যে সমাজের বিষবৃক্ষ। উপন্যাস শেষে প্রচ্ছদটাও যে আমার আরেকটা ভালোবাসার জায়গা। তাই প্রচ্ছদ শিল্পীকে বলব, এক কথায় অসাধারণ। আপনাদের যুগলবন্দিতে এরকম আরও অনেক কাজ আমরা আগামীতে দেখতে চাই। অদ্ভুত ও জটিল কিছু মানুষের গল্প, দুই নারীর জীবনে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা, গ্রামীন সরল সব মানুষদের সারল্য, লুকায়িত ভালোবাসা, অস্থির একটা সময় এ সবকিছুরই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ 'চন্দ্রলেখা'।

Md Saifullah (Saif)
Md Saifullah (Saif) ভেরিফাইড
26 Jun 2023

চন্দ্রলেখা - একটি মডার্ন ক্ল্যাসিক? _________________________________ "এমন মানুষের শত্রু কারা?' - চন্দ্রলেখা উপন্যাসের ৮৭ পৃষ্ঠায় প্রশ্নটি আছে। আর উত্তর? খুঁজতে হলে বুঝতে হবে একটি সময়কে। কোনো কোনো উপন্যাসে কেবল গল্পই প্রধান, আপনি গল্প পড়বেন, ভাল কিংবা খারাপ অনুভূতি নিয়ে গল্প শেষ করবেন, এবং ভুলে যাবেন। আবার কিছু উপন্যাস প্রশ্ন রেখে যায়; ছোট গল্পের মতো তাদের পড়ে মনে হয়, শেষ হয়েও হইলো না শেষ। বারোয়ারি জীবনের গল্প যখন রেশ রেখে যাওয়া অনুভূতি তৈরি করে, তখন মনে হয় একটি উপন্যাস কেবলই গল্প নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। লেখক আবদুল্লাহ আল ইমরানের 'চন্দ্রলেখা' এমনই এক গল্প যা পড়ে আপনি একটি আয়নার দেখা পান, যেখানে সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে; আপনার কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলে, কিছু উত্তরের প্রশ্ন খুঁজে পান। সমরেশের ত্রয়ী উপন্যাস পড়ে যেমন নকশালী সময়ের নকশা আপনার মনোজগতে দাগ কাটে, তেমনি চন্দ্রলেখা খুলনা অঞ্চলের এমন একটি সময়ের চিত্র উপস্থাপন করে, যা আপনাকে এক স্বার্থপর জগতের কথা বলে। চন্দ্রলেখার গল্পটি শুরু হয় নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে। একটি আশঙ্কাজনক সংবাদ শুনে যে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি, সেই উদ্বেগের স্রোত বেয়ে বয়ে চলে উপন্যাসের গতিবিধি। নিছক সামাজিক উপন্যাসের উপাদানের ইঙ্গিত দিয়ে শুরু হওয়া চন্দ্রলেখা শেষপর্যন্ত টান টান উত্তেজনার এক গল্পে পরিণত হয়। চরিত্র চিত্র অসংখ্য চরিত্র গল্পের প্রয়োজনে কিংবা সময়ের দাবিতে উঠে এসেছে এই উপন্যাসে; কেউ হারিয়ে গেছে, কেউ জুড়ে থেকেছে শেষ পর্যন্ত। তবে, অগণিত চরিত্রের মধ্যে শশী চরিত্রটিই ছিল ধ্রুবক হয়ে; শুরু থেকে শেষ অবধি, স্বপ্ন থেকে স্বপ্নভঙ্গের নানান বাঁক এই গল্পে দেখা গেছে শশীর দৃষ্টি দিয়ে। শশীর পিতা মোক্তার মিয়াও 'প্যাসিভ' চরিত্র হয়ে গোটা উপন্যাসের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব রেখেছেন। এই উপন্যাসের সূচনাও হয় - মোক্তার মিয়া জেলে গেছেন - এমন এক আচমকা দু:সংবাদে। মোক্তার মিয়া কী জেল থেকে মুক্ত হতে পারেন, নাকি জড়িয়ে যান আরো জটিল কোনো গোলকধাঁধায়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই উপন্যাসে একে একে উন্মোচিত হতে থাকে কিছু সামাজিক অন্ধকারের গল্প। শুরু থেকেই উপন্যাসে খল চরিত্র হিসেবে ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ করেছেন তালেব নামক গ্রাম্য এক যুবক। বখে যাওয়া গ্রামীন যুবকের চরিত্রে তালেবকে ভালই মানিয়ে গেছে। তবে, এই উপন্যাসে আতহার চেয়ারম্যানকে লেখক দারুণভাবে চিত্রায়িত করেছেন। এই চরিত্রের ভেতরে দোদুল্যমান এক মানসিকতার আভাস পাওয়া যায়। তাকে সন্দেহ করতে গেলে মনে হয়, কোথাও ভুল হচ্ছে। আবার তাকে সাধু ভাবলেও ভাবনাটা কেমন অসম্পূর্ণ মনে হয়। শশীর মা এবং মোক্তার মিয়ার স্ত্রী রূপে লায়লা বানু ছিলেন শাশ্বত বাঙালি নারীর মূর্ত প্রতীক হয়ে। একই সাথে পতিপ্রাণা ও সন্তানের অকল্যাণের ভয়ে ভীত মাতৃরূপ দেখা গেছে এই নারীর চরিত্রে। তবে, এই উপন্যাসে আচমকা কিছু চরিত্র এসেছে যাদের গুরুত্ব গল্পের প্রয়োজনে কতটুকু প্রাসঙ্গিক, তার উত্তর আরো জোরালো হতে পারত বলে মনে হয়েছে। যেমন - জামিল নামে এক শিল্পী মানসিকতার ব্যক্তির আগমণ ঘটে উপন্যাসের মাঝামাঝি সময়ে, যার সম্পর্কে উপন্যাসের কোনো পর্যায়েই কোনো ইঙ্গিত ছিল না। ফলে, এই চরিত্রটির সাথে পাঠক হিসেবে মিশে যাওয়া সহজ ছিল না যেহেতু চরিত্রের আগমণের কারণ কিংবা গন্তব্য ছিল অনিশ্চিত। এছাড়া, কিছু চরিত্র পরিণতি পায় নি তবে গল্পের প্রয়োজনেই তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা জানার ব্যাকুলতা ছিল। এরকম একটি চরিত্র হলো, কামাল পাশা, যিনি উপন্যাসে আমাদের পরিচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট হরিচরণ মিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে। গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনায় কামাল পাশার সংযুক্তি থাকায়, তার পরিণতিও কী হয়েছিল সেটি পরিষ্কার হলে গল্প পাঠ পূর্ণতা পেত বলে মনে হয়েছে। কামাল পাশা, শিল্পী জামিলের মতোই আরেকটি আগন্তুক চরিত্র মতিন। এই চরিত্রটি উপন্যাসে একটি দারুণ সংযোজন এই অর্থে যে, চরিত্রটি ছিল রহস্যঘেরা এবং এই চরিত্রটি গল্পে অর্থবহ একটি ভূমিকা রাখতে পেরেছে। এর বাইরে, যদি এই উপন্যাসের চরিত্র বলতে হয়, তাহলে সেটি হলো সময়। লেখক খুলনা অঞ্চলের অরাজক এক সময়কে এঁকেছেন গল্পের মধ্যে। করাতকলকেন্দ্রিক জনপদ, খতম পার্টি, সর্বহারা পার্টি, রাজনীতির দাবার চাল-- বিষয়গুলো উঠে এসেছে। গ্রামের চেয়ারম্যান, থানা পুলিশ, জেল হাজত, ক্ষুদ্র ঋণ সহ অনেক ছোট ছোট ডিটেলিংয়ে লেখক বাস্তবতার সাথে মিল রেখেই বর্ণনা করেছেন গল্প যা সময়কে এবং ঐ সময়ের মানুষগুলোর জীবনকে বুঝতে বেশ কাজে লেগেছে। পাঠ অনুভূতি কবিরা নাকি ভাল গদ্যকার হন না এমন একটি 'সংস্কার বা কুসংস্কার' প্রচলিত আছে সাহিত্য অঙ্গণে। তবে, যারা কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক তারা যে দারুণ গদ্য জন্ম দিতে পারেন, এটি বার বার প্রমাণিত হয়ছে। বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ কবিতাপ্রেমী ছিলেন। কবিতাপ্রেমী মানুষ পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষ ত্রয়ী জনপ্রিয় লেখক সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দু। চন্দ্রলেখা উপন্যাসের প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠায় লেখক আবদুল্লাহ আল ইমরান যে সৌন্দর্যের জন্ম দিয়েছেন তার গদ্যে, তাতে সচেতন পাঠকমাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন, লেখক বাংলা কবিতার নিবিষ্ট এক পাঠক। প্রথম কয়েক পাতায় শব্দের ব্যবহার, বাক্য গঠন ও কবিতার মতো কোমল এক ক্ল্যাসিক বর্ণনাভঙ্গিই আরামদায়ক পাঠ অভিজ্ঞতার কারণ। তবে, একই সাথে লেখক একজন সাংবাদিকও। তাই, এই উপন্যাসের বর্ণনাভঙ্গিতে সাংবাদিকতার ঘ্রাণও পাওয়া যায়। লেখক যে জায়গাগুলোতে সাংবাদিকসুলভ বর্ণনা ব্যবহার করেছেন, সেখানে আবেগের বহিঃপ্রকাশ কিছুটা ছিল সীমিত এবং চরিত্রের অনুভূতিও ছিল কিছুটা কুয়াশাচ্ছন্ন। উদাহরণস্বরুপ, চন্দ্রলেখায় শশীর জীবনের মোড় ঘোরানো একটি ঘটনা ঘটে যখন কামাল পাশা চরিত্রের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু, ঐ ঘটনার পর লেখক সে চ্যাপ্টার খুব দীর্ঘায়িত করেন নি এবং ওমন একটি মোড় ঘোরানো ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলোর মানসিক টানাপোড়েন কেমন হতে পারে, সেটিও খানিকটা অনুপস্থিত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। তবে হতে পারে, হয়ত, লেখক বাহ্যিক টানাপোড়েনকেই দৃষ্টান্ত করতে চেয়েছেন বলেও গল্পের প্রবাহ এভাবে বয়ে গেছে। এই উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা দিক খুব ভালভাবেই লেখক মেইনটেইন করে গেছেন, সেটি হলো, আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার। খুব সতর্কতার সাথে গোটা উপন্যাসেই সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার টানকে রক্ষা করা হয়েছে যা এই উপন্যাসকে বিশেষ এক মাত্রা দিয়েছে। আগেই বলেছি, পাঠ অভিজ্ঞতা বলছে লেখক কবিতার গ্রাহক। ফলে, এই উপন্যাসে দারুণ কিছু উপমাও খুঁজে পাওয়া যায় যা সাধারণ গদ্যপ্রধান গল্পে সচরাচর দেখা মেলে না। এক জায়গায় লেখক চরিত্রের অবস্থা বোঝাতে বলেছেন, 'তেল ফুরিয়ে আসা বাতির মতো হাঁপানি'। যারা তেল ফুরানো বাতি দেখেছে, তারা দারুণভাবে উপমাটির প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাবে বলে মনে হয়। আবার এক জায়গায় পাওয়া গেল, 'নদীভাঙ্গণে উপড়ে পড়া গাছের মতো লুটিয়ে পড়া' তুলনাটি। অনিশ্চয়তা বোঝাতে লিখেছেন, "বাড়ির খবর আশি বছরের বুড়া মানুষের মতো।" আবার দুশ্চিন্তা বোঝাতে লেখক ব্যবহার করেছেন, আঠারোবাঁকি নদীর জোয়ারকে। উপন্যাসে দারুণ কিছু সংলাপ পাওয়া যায় যা চিন্তা উদ্রেককারী। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে উপন্যাসে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, "দিনশেষে সবাই কেন পুরুষ হয়ে যায়?' ভিন্নমতের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক উক্তিও খুঁজে পেয়েছি এই উপন্যাসে, লেখকের এক চরিত্র বলেছেন, "চেনা পথের বাইরে আর সব পথরে ভুল বলার সুযোগ নাই।" সর্বোপরি, উপন্যাসটিকে নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ করার সুযোগ নেই৷ সামাজিক উপন্যাস বা থ্রিলার উপন্যাস যে নামেই অভিহিত করা হোক, এই গল্প দিনশেষে আদর্শচ্যুত এক সময়েরই প্রতিলিপি, যে সময়টাকে ধরার তাগিদ ছিল লেখকেরও। পাঠ সমালোচনা ও প্রত্যাশা উপন্যাসটির বিষয়বস্তু কৌতুহল-উদ্দীপক। গ্রাম্য রাজনীতি ও সেইসময়কার গুপ্ত সহিংসতার প্রেক্ষাপটে এবং আঞ্চলিকতার বর্ণনাকে প্রাধান্য দিয়ে উপন্যাসের প্লট দাঁড়িয়েছে। তবে, উপন্যাসটি পরবর্তীতে লক্ষ্য থেকে বিস্তৃত হয়ে শশী ও তার মায়ের পুরুষশাসিত সমাজে বেঁচে থাকার দ্বন্দ্বে মোড় নেয়। এখানে, নারী কিভাবে প্রতিটি পদে পদে প্রতিকূলতার শিকার হয় এবং বিপদে পড়লে নারীর লড়াইটাও কিভাবে 'এতিম' বা নি:সঙ্গ এক লড়াইয়ে রূপ নেয়, সেই দিকটিও উঠে এসেছে। ফলে, আদর্শহীন যে সময়ের আঁচড় লেখক কাটতে চেয়েছেন গল্পে, সেটি দারুণ এক পরিণতি পায় যখন বর্তমান সময়ের সাথেও গল্পটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, বিশেষত নারী-কেন্দ্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। তবে, এই উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্র হওয়ায় অনেক চরিত্রের সাথেই পাঠকের যোগাযোগটি স্থাপিত হওয়া একটু মুশকিল হয়ে পড়ে। এর মধ্যেও শশীর চরিত্রটি কিংবা লায়লা বানু অথবা চরিত্রহীন তালেবের চরিত্র, 'কৌশলী' চেয়ারম্যানের চরিত্র আমাদের খুব নিকটতম চেনা মানুষ হয়ে ওঠে। এদেরকে আমরা প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের আশেপাশেই দেখি নানান অবতারে। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, গল্পের প্রবাহে ধারাবাহিক আকর্ষণ ধরে রাখার প্রচেষ্টায় আরো একটু যত্ন নেয়া যেত বলে মনে হয়। শশী যে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে, এইচএসসি পড়ুয়া কন্যা হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে তার প্রতিক্রিয়াগুলো আরেকটি বিস্তারিত জানতে পারলে পাঠক হিসেবে চরিত্রের সুখ বা দু:খকে অনুভব করার স্পেস পাওয়া যেত আরো খানিকটা। যদিও, গল্পের প্রয়োজনে শশীকে যে দৃঢ়তা দেখাতে হয়েছে, তা এই সময়ে বহু হতাশ তরুণীকে আঁধারেও টিকে থাকার আলো দেখাতে পারে, তাই এখানে লেখকের কৃতিত্ব প্রাপ্য। * মানুষের জীবনে দুটি চক্র ঘুরে ফিরে আসে। অমাবশ্যার চন্দ্রহীন রাতে আশাহত মানুষের আর্তনাদ যতটা তীব্র, আবার ভরা পূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় মায়াময় পৃথিবীতে হয় বেঁচে থাকার সাধ। পৃথিবীতে পরাজিত হওয়ার নানান কারণ আছে, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কেবল একটি গন্তব্যের প্রয়োজন। 'চন্দ্রলেখা' উপন্যাসটির স্বার্থকতা এখানেই যে, গল্পটি অমানুষের সমাজে মানুষ হয়ে পরাজিত না হওয়ার লড়াইকেই প্রাধান্য দিয়েছে; ফলে, একটি আদর্শ বিবর্জিত সময়কে ধরতে গিয়ে লেখক সুনিপুণ দক্ষতায় বিকল্প এক জীবন আদর্শের ইঙ্গিতও রেখে গেছেন। 'মডার্ন' ক্ল্যাসিক হিসেবে কী তবে 'চন্দ্রলেখা' জায়গা পাবে? মহাকালের হাতেই ছেড়ে দেয়া যাক এই প্রশ্নের ভবিষ্যত; তবে, প্রান্তিক জনপদের অস্থির সময়ে রেখে যাওয়া বিবিধ প্রশ্নচিহ্নের আড়ালে কিছু মানুষের উত্তর খোঁজার এই গল্প ছড়িয়ে পড়বে কৌতুহলী পাঠকের দুয়ারে, এই প্রত্যাশা রাখা যেতেই পারে। রিভিউয়ার- মো: সাইফুল্লাহ (সাইফ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Review Upload 1
Review Upload 2
Tanvir Jahid
Tanvir Jahid ভেরিফাইড
25 Jun 2023

#ইমরানেরগল্পকথাবুকরিভিউপ্রতিযোগিতা ⚫ বই পরিচিতি বইয়ের নাম : চন্দ্রলেখা লেখকের নাম : আবদুল্লাহ আল ইমরান প্রচ্ছদ : সানজিদা পারভীন তিন্নি প্রকাশনা : অন্বেষা প্রকাশন ধরন : সমকালীন সামাজিক উপন্যাস অক্ষর বিন্যাস : নাছির উদ্দিন প্রথম প্রকাশ : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ মুদ্রিত মূল্য : ৪৭০.০০ টাকা মাত্র পৃষ্ঠা : ২৬৪ ⚫ নামকরণ: নামের মাঝে পরিচয় লুকিয়ে থাকে। চন্দ্রলেখা উপন্যাসের নামের মাঝেই উপন্যাস সম্পর্কে লেখক বার্তা দিয়েছেন। উপন্যাসের চরিত্রের সাথে নামের সম্পর্ক রয়েছে। চন্দ্রলেখা অর্থ - চাঁদের ‍দুই রাত, আমাবস্যার পর রাত বা চাঁদের রশ্মি ইত্যাদি। এখনে তিনটা অর্থের মাঝে উপন্যাসের ঘটনাবলী ও চরিত্রের ব্যাপক মিল রয়েছে। ⚫ প্রচ্ছদের আলোচনা : প্রথম দেখায় ভালোলাগাটা সবসময় একটি সুন্দর অনুভূতি তৈরি করে যা মন ছুয়ে যায়। চন্দ্রলেখা উপন্যাসের প্রচ্ছদটি এক দেখায় ভালোলাগার মতো। উপন্যাস পড়ার সময়ে প্রচ্ছদ বেশী ভালোলাগতে শুরু করবে। গল্পের সাথে ও উপন্যাসের নামের সাথে প্রচ্ছদ খুব মানানসই। প্রচ্ছদ হলো উপন্যাসের দরজার সমতুল্য। যে বাড়িতে প্রবেশ পথের দরজা সুন্দর সেখানে প্রবেশের অনুভূতি ভিন্নরকম। প্রচ্ছদ শিল্পি তার দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সুন্দর প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন। ⚫ আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার: লেখক চন্দ্রলেখা উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। ভাষার সাথে যখন ঘটনা প্রবাহ এগিয়ে চলে তখন উপন্যাস পড়ার আকাঙ্খা বৃদ্ধি পায়। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে মানিক বন্দোপাধ্যায় যেরুপ ভাষাশৈলী দ্বারা পদ্মার পারের মানুষের কথা তুলে ধরেছেন লেখক আব্দুল্লাহ আল ইমরান তার উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষা দ্বারা গ্রমীণ জীবনের গল্প উপন্যাস আকারে তুলে ধরেছেন। ⚫ ভূমিকা: বর্তমানে বিষয় ভিত্তিক কাজ তুলনামূলক কম। কোন জনপদ ও গ্রামাঞ্চল কে ঘিরে উপন্যাসের সংখ্যা আরো কম। এমন সময়ে গ্রাম বাংলার গল্প নিয়ে উপন্যাস। তাও আবার আঞ্চলিক ভাষায়! বর্তমানে যা তেমন চোখে পারেনা। দুএকটা পাওয়া গেলেও তারমধ্যে লুতুপুতু প্রেম আর ঘুরানো প্যাঁচানো কাহিনি দিয়ে ভরপুর। এমন সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় গ্রাম বাংলার নোংরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক অবস্থান উপন্যাস আকারে বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে গল্প বুনেছেন। লেখার মাধ্যমে পাঠকের নিকট বার্তা পৌঁছেছেন। ধারার বিপরীতে গিয়ে নতুন আঙ্গিকে পাঠক কে পরিচয় করিয়েছেন একটা জনপদের সাথে। সবদিক বিচারে লেখক চন্দ্রলেখা উপন্যাসে পরিপূর্ণ ভাবে তার লেখালেখির মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। চন্দ্রলেখা উপন্যাস একটি সামাজিক উপন্যাস। দুই নারীর জীবনের সংগ্রামের উপন্যাস। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বামীহীনা এক অসহায় নারীর জীবনবৃত্তান্ত। সামাজিক ভাবে কতো চড়াই উতরাই পার করে একজন নারীকে বেচে থাকতে হয়। সমাজের কুদৃষ্টি কিভাবে গ্রাস করে একজন নারীকে তিলেতিলে শেষ করে দেয়। হার না মেনে নিজের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে কিভাবে সংগ্রাম করতে হয় লেখক চন্দ্রলেখা উপন্যাসে তা সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতিটা চরিত্রের মধ্যে দেখিয়েছেন পাকা হাতের ছোঁয়া। উপন্যাসটা পড়ে মনে হবে লেখক যেনো নিজের গল্প বলছেন। কখনো মনে হবে নিজের আশেপাশে ঘটে চলা ঘটনাবলি নিয়ে বলছেন। লেখক উপন্যাসের প্রতিটা প্লটের শেষে এতোটা ধূম্রজাল তৈরি করেছেন যা পরের ঘটনা জানার আগপর্যন্ত পাঠকের প্রচণ্ড আগ্রহ তৈরি করে নিবে। ⚫উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ ও চরিত্র বিশ্লেষণ: থানার অসহায় মানুষের দাম নেই। তা মোটেই ঠাহর করতে পারেনা লায়লা বানু। মোক্তার মিয়ার জন্য বারান্দায় বসে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। পাশে বসে আছে ছোট হাবু। আমাদের দেশে যা হয় আরকি মানুষের কান্নাকাটি আর ঝগড়াঝাটি দেখলে একদল মানুষ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। লায়লা বানু আর শশীর দিকে উপস্থিত জনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। থানার কর্তব্যরত ডিউটি আফিসার বিরক্তি নিয়ে কনস্টেবলদের আদেশ দিলেন আপদ বিদায় করো। অবস্থা বেগতিক দেখে শশী মাকে থামাতে মরিয়া হয়ে উঠে। লায়লা বানু স্বামীর চিন্তায় অস্থির হয়ে পরেন। নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। আদালতের আঙ্গিনায় শুরু হয় শশী আর লায়লা বানুর দৌড়ঝাঁপ। গল্পটা এভাবেই এগিয়ে যেতে শুরু করে। মোক্তার মিয়া আটক হইছেন কাশেমের জবান বন্দিতে। ডাকাতির মাল বিক্রিতে সাহায্য ও আন্ডারগ্রাউন্ডের পার্টির লোকের সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা দাবী করেছেন পুলিশ। করাত কলে কাজ করা দিনমজুর মোক্তার মিয়া শশীর বাবা। সহজসরল একটা মানুষ এমন কাজ করতে পারে বলে বিশ্বাস হয়না শশীর। কিন্তু তাদের কথা কে মানে। কোটকাচারিতে ঘুরতে ঘুরতে দীর্ঘ সময় পার হলেও মোক্তার মিয়ার জামিন হয়না। তারিখের পর তারিখ অতিবাহিত হয়ে যায়। কিন্তু শশীর বাবা মোক্তার মিয়া আর ফিরে না। লায়লা বানু ঘুমথেকে উঠে পাশে খেয়াল করে দেখে মানুষটা পাশে নাই। বিছানা খালি পরে আছে। বহুদিন পরে ঘড়ে ফিরে স্বামী হটাৎ গায়েব হয়ে যাওয়াতে লায়লা বানুর আন্তরে ভয় কাজ করতে শুরু করে। লালয়া বানু বিলাপ শুরু করে দেয়। শশী ঘুম থেকে উঠে কুলকিনারা করতে পারেনা। অনেক খোঁজাখুঁজি পর মোক্তার মিয়ার পেট চিরা লাশ পাওয়া যায় করাত কলের পাশে। আমরা যখন সিনেমা দেখি কিছু চরিত্র থাকে যাকে মেনে নিতে কষ্ট হয়। মনের অজান্তে মুখ দিয়ে বকা চলে আসে। উপন্যাসে তালেবের চরিত্রটা ঠিক তেমন। পুড়ো উপন্যাস জুড়ে তালেবের প্রতি প্রচুর রাগ জন্মেছে। মুহুর্তে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে হারামিটাকে। কিন্ত এযে আমাদের গ্রাম বাংলার নোংরা রাজনীতি। সর্বত্ত বিরাজমান ঘটনা। এক তালেব কে বাচাতে দাঁড়িয়ে যায় বহু তালেব। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ অবধি আতাহার চেয়ারম্যানের ভূমিকা ছিলো রহস্যময়। কখনো লোকটাকে ভালো মানুষ মনে হয়েছে। কখনো মনে হয়েছে ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর চেহারা। যার সকল কর্মকাণ্ডের পিছনে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক মহা চক্রান্ত । একটা সময় গ্রামগঞ্জে সর্বহারাদের উৎপাত ছিলো ব্যাপক। সেই ঘটনার আলোকে তৈরি চরিত্র হলো চেয়ারম্যানের ভাই। যার নাম মোতা খাঁন। খতম পার্টির লিডার। দীর্ঘ বারোবছর পর মোক্তার মিয়ার জানাজায় তাকে দেখা যায়। গ্রামের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় নানায় গল্প। যার ডালপালা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় বহুদূর। তৈরি হয় নানান রহস্য। উপন্যাসের গল্পটা মোর নেয় এখনেই। মতিনের চরিত্রটা উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে এসে মন খারাপ করে দেয়। গ্রাম বাংলার মাদরাসা শিক্ষায় কিছুটা কমতি আছে। যা আচর মতিনের জীবনে বইতে হয়েছে। আসহায় লায়লা বানু, ও শশীদের পরিবারে মতিন হয়ে উঠে আশার প্রতিক। উপন্যাসের সকল চরিত্রের মাঝে সংগ্রামী ও সাহসী নারীর ভূমিকা শশীর। এক কথায় বলতে গেলে শশীর জীবনের গল্প জুড়েই উপন্যাস। ইন্টার পরিক্ষায় ফল পাবার আগের দিন পিতাকে হারানোটা উপন্যাসের সবচাইতে কষ্টের মুহূর্ত। পিতার মৃত্যুর পরে মা লায়লা বানু আর ছোট ভাই হাবুকে নিয়ে এগিয়ে চলা। গ্রামের কামুক পুরুষদের লোভতুর দৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলতে যে সংগ্রাম করতে হয়েছে তা শশীর চরিত্রে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। শশী চাঁদের অর্থে ব্যবহার হইলেও তার জীবন জুড়ে শুধুই অন্ধকার। কিন্তু শশীর জীবনে আলো হয়ে আসেন জামিল আহমেদ। আবির চরিত্রটা খানিকের তবে শশীর জীবনে আবির এক সিংহ পুরুষ। পাশার হাত থেকে নিজেকে যখন বাচাতে ব্যার্থ হয় শশী তখন আবিরের আগমন হয়। উপন্যাসে আবিরের উপস্থিত সামান্য হলেও তার ভূমিকা ব্যাপক। ⚫ভালোলাগার উক্তি: "জগতের কিছু কান্না আছে, যার ভাগ কাউকে দিতে হয় না। কিছু কান্না নিজের। কিছু কান্না আকান্ত গোপন" "যার ঠিক যে মানুষটা যায়, সে-ই কেবল ঠিক ঠিক ঐ মানুষটার জন্য শূন্য অনুভূতি ধারণ করতে পারে। অন্য কেউ পারে না, তা সে যতই নিকটে থাকা মানুষ হোক" "জীবন আসলে কোন সরল রেখা না। সবসময় সোজা পথে চলেও না জীবন। কারণ তোমার চিনা পথের বাহিরেও অসংখ্য পথ আছে। সেই সব পথ আবিষ্কারের আনন্দও আছে। হুট করে অচেনা কোন পথে ঢুইকা পইড়া আনন্দ না পাও, দুঃখ পাইও না। মনে রাখবা, চেনা পথের বাহিরে আর সব পথরে ভুল বলার সুযোগ নাই" ⚫ উপন্যাসের সমালোচনা মতিন চরিত্রটা নিয়ে যে তথ্যা দেওয়া হয়েছে। তা অতিরঞ্জিত মনে হয়েছ। আবাসিক মাদরাসাগুলোর মধ্যে পত্রপত্রিকায় মাঝেমধ্যে কিছু ত্রুটি দেখতে পাই তা অস্বীকার করা যায় না। তবে মতিন চরিত্রটা যেভাবে আনা হয়েছে । মাদরাসা শিক্ষার ব্যাপারে পাঠকের নিকট একটি ভুল বার্তা পৌছানোর প্রবল সম্ভবনা রয়েছে। উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ ও চরিত্র বাস্তবিক হবে একজন পাঠক হিসেবে লেখকের কাছে আর্জি জানাই। এছাড়া ছোটখাটো বানান ভুল ছাড়া তেমন কিছু চোখে পরেনি। ⚫ অনুভূতি প্রকাশ : উপন্যাস পড়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। অনেক সময় বিষন্ন মন নিয়ে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছি । যেন আমার চোখের সামনে সব ঘটে গেলো আমি তাকিয়ে দেখলাম কিছুই করতে পারলাম না। গল্পে এতোটাই ঢুবে গিয়েছিলাম উপন্যাসের মোহ কাটতে সময় লেগেছে কয়েকদিন। উপন্যাসের চরিত্রে নিজেকে ভেবেছি বহুবার। আমার কাছে মনে হয়েছে একটা মানুষের জীবনে কতোটা কষ্ট আসতে পারে! সর্বোপরি উপন্যাসটা আমার জন্য একটা অনুপ্রেরণা। সাংগ্রাম করে কিভাবে জীবনযাপন করতে হয় চন্দ্রলেখা উপন্যাসের চরিত্রে লেখক তা ফুটিয়ে তুলেছেন। চন্দ্রলেখা উপন্যাসের গল্প আপনাকে আমাকে জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে সাহায্য করবে। রিভিউ দাতা : জাহিদুল ইসলাম তানভীর ঠিকানা : পশ্চিম শিয়াচর, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ পেশা : শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান : সরকারী তোলারাম কলেজ বিভাগ : রাষ্ট্রবিজ্ঞান(৩য় বর্ষ) মোবাইল : 01689591467 ই-মেইল : tanvir.jahid@gmail.com

প্রশ্ন ও উত্তর (Q/A)

দুঃখিত, কোনো প্রশ্ন উত্তর পাওয়া যায়নি।

সাদৃশ্যপূর্ণ পণ্যসমূহ (Similar Products)