চন্দন গন্ধের বন
বই কালেকশন

Buy চন্দন গন্ধের বন Online in Bangladesh

লেখক: আবদুল্লাহ আল ইমরান

4.68
(13 টি কাস্টমার রিভিউ)| স্টকে আছে
Highlights:
  • Author: আবদুল্লাহ আল ইমরান
  • Publisher: শিখা প্রকাশনী
  • Isbn: 9789849334729
  • Number Of Pages: 223
  • Language: বাংলা
  • Edition: 1st Published, 2022
৳ 409৳ 46512% ছাড়
স্টকে আছে
উপলব্ধ প্রোমো কোডসমূহ:
দ্রুত ডেলিভারি
৭ দিনের রিটার্ন
১০০% অথেনটিক

পণ্য সারসংক্ষেপ (Summary)

অরণ্যর জীবন থেকে দুজন মানুষ নিখোঁজ হয়- একজন ছোট মামা, অন্যজন দিশা। অরণ্য তাদের খুঁজে বের করতে চায়। সে যাত্রায় আচমকা সঙ্গী হয় মেডিকেল-ছাত্রী রায়া। দৃশ্যপটে দেখা যায় শায়লা আর রাফিকে, যাদের জীবনের অন্তহীন অঘটনে জড়িয়ে যায় অরণ্যও। তারপর? দিশাকে কি শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যাবে? মেয়েটা কি বেঁচে আছে? ছোট মামাই-বা কোথায় হারাল? জটিল সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে চলে কসমোপলিটন গল্প। ওদিকে রায়ার নরম-কোমল আঙুল খেলা করে অরণ্যর অবাধ্য ঘনকালো চুলে। নুয়ে এসে মমতার পরশ বোলায় অবসাদগ্রস্থ ম্লান দুটি চোখে আর স্নেহপলাতক ঠোঁটে- যে পরশ অরণ্যকে মায়াবী এক ঘোরের জগতে নিয়ে যায়। যেখানে ছড়িয়ে আছে তীব্র মাদকতাময় চন্দনের ঘ্রাণ। ঘ্রাণটা কি রায়ার শরীরের? হৃদয়ে গভীর মমতা থাকলে নারীর শরীর থেকে বুঝি এমনই সুবাস ছড়ায়!

রিভিউ ও রেটিং (Review & Rating)

4.68
(13 টি কাস্টমার রিভিউ)
5
62%
4
31%
3
8%
2
0%
1
0%
Rafiquzzaman Aqib
Rafiquzzaman Aqib ভেরিফাইড
16 Jun 2023

❝ চন্দন গন্ধের বন ❞ - দেখা শহরের অদেখা গল্প ও চিরাচরিত মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েনের মাঝেও একপলক দেখা স্বপ্নের চিত্র! 🟦 বই সম্পর্কিত তথ্য: বই : চন্দন গন্ধের বন লেখক : আবদুল্লাহ আল ইমরান প্রচ্ছদ : সানজিদা পারভীন তিন্নি ধরণ : সমকালীন গায়ের মূল্য : ৪৭০ টাকা প্রকাশনী : শিখা পৃষ্ঠা : ২৬৪ টি (Rating : 09 out of 10) মধ্যবিত্ত জীবনের বন্দিশালায় বিঁধে থাকা অনুভূতি ও হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসের গল্প ❝ চন্দন গন্ধের বন ❞ যে প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান বেঁচে থাকার দায়ে হাজারো দুরূহ সংগ্রাম। 🟦 পাঠপ্রতিক্রিয়া : পৃথিবীর সকল দেশেই গ্রাম ও শহর দুটি ভিন্ন সত্তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। সেই স্থান থেকে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশেও গ্রামীণ ও শহুরে সমাজের অস্তিত্ব রয়েছে। রয়েছে জীবনমানে বহু পার্থক্য, মগজে-মননেও রয়েছে একরাশ ভিন্নতা। আর এ কারণেই অহরহ ঘটছে বহু ঘটনা, জন্ম হচ্ছে নিত্যনতুন কাহিনির। এমন কতিপয় ঘটনা আমাদের জানা হলেও অজানা রয়ে যায় অনেক ঘটনাই। যেগুলো চিন্তাশীল সৃজনশীল মনকে চিরকালই নাড়া দিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। সেরকমই কিছু বাস্তবধর্মী কাহিনি নিখুঁত শব্দের ব্যবহারে তুলে ধরেছেন কথাসাহিত্যিক ' আবদুল্লাহ আল ইমরান ' স্যার। বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবনযাপনের হালচাল, শহুরে মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা, মধ্যবিত্ত জীবনের সাতরঙা ধূসর গল্প - এমনই দিশেহারা মানুষদের জীবনযাপন গল্পকথার বুননে সেলাই করেছেন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে তবে নতুন আঙ্গিকে। বইয়ের নামটা অপূর্ব সুন্দর। নাম ও প্রচ্ছদের মধ্যে এমন এক জাদুশক্তি রয়েছে, যা সব শ্রেণির পাঠককে এক মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে ফেলতে পারে নির্দ্বিধায়। প্রচ্ছদটি গভীরভাবে অবলোকন করলে বৃক্ষ তলে উপবিষ্ট নর-নারীর চিত্রটি দ্বারা উপন্যাসটির নাম ও কাহিনির স্বার্থকতা বোঝা যায়। খুব সুন্দর সাবলীল শব্দধারায় রচিত বই ' চন্দন গন্ধের বন ' এবং একের পর এক রোমাঞ্চে পরিপূর্ণ। উপন্যাসে এক রহস্যের সমাপ্তি হয় শত রহস্যের সৃষ্টি দিয়ে। উপন্যাসটি নিঃসংকোচে সুখপাঠ্য। 🟦 কিছু কথা : পাঠকপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আবদুল্লাহ আল ইমরান স্যারের উজ্জ্বল সৃষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম ❝ চন্দন গন্ধের বন ❞ উপন্যাসটি। লেখকের সাহিত্য প্রতিভা সুশোভিত ও সুষমামণ্ডিত। ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরার ক্ষমতায় ভীষণ বিজ্ঞ। ঔপন্যাসিকের মাঝে আলাদা এক দ্যোতনা আছে। মানুষের চিন্তার জগৎ এত সুন্দর হয় কী করে? যেমন পরিপাটি, সাহসী ও বিভোর করা লেখনী তেমনই যথেষ্ট সুনিপুণভাবে তুলে ধরার সক্ষমতাও বিদ্যমান। শিল্পের যেথায় সৃষ্টি, কারিগরের পরিশ্রম সেথায় এক আকাশ পরিমাণ তা ঠিকই প্রমাণ দেয় জনাব আবদুল্লাহ আল ইমরানের চমৎকার সৃষ্টি ❝ চন্দন গন্ধের বন ❞ উপন্যাসটি। উপন্যাসের মূল চরিত্র অরণ্যকে কেন্দ্র করে সময়কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে নানা ছন্দে। সম্পূর্ণ উপন্যাসটি ভীষণ আবেগ ও প্রগাঢ় অনুভূতিতে ঠাসা। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সুখ-দুঃখ ও চাওয়া-পাওয়ার বেড়াজালে বন্দী এক অদ্ভুত উপন্যাস। পুরো উপন্যাসেই মধ্যবিত্ত পরিবারের দিনলিপি, শত কষ্ট বুকে চেপে ছুটে বেড়ানো মানুষ এবং দারিদ্র্যের কষ্ট ও নিষ্ঠুরতম সমাজজীবনকেই উপস্থাপন করা হয়েছে। এক কথায় মানুষের অদ্ভুত তথা ভয়ংকর সুন্দর জীবনের বীজই লেখক চমৎকারভাবে অঙ্কুরোদগম করেছেন। উপন্যাসটি পড়ার সময় কল্পনার এক গভীর সমুদ্রে ভাসছিলাম। অন্যরকম এক অনুভূতি। নিজেকে মাঝেমধ্যে আবিষ্কার করছিলাম চন্দন গন্ধের বনে। যে বনের মানুষগুলো স্বাধীন এবং শিল্পসমৃদ্ধ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপন্যাসের ঘটনাসমূহ আলোকচিত্রের ন্যায় আমার চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছিল। খুবই অনুভূতিপ্রবণ একটি বই। 🟦 সার্বিক মূল্যায়ন : চন্দন গন্ধের বনে সবচেয়ে বেশি স্থান পেয়েছে সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের কাহিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের পরিণতি না হওয়া বিবাহ পূর্ববর্তী সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন, অসম সম্পর্ক, ঘাত-প্রতিঘাত, আনন্দ-বেদনা ও পাওয়া না পাওয়াই উপন্যাসটির মূল উপজীব্য। উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলো তরুণ বয়সের, খুব আবেগকাতর, আশাবাদী ও বুকে স্বপ্ন বিদ্যমান। এ উপন্যাসের ভিতরকার বাস্তবতাকে পাঠকের নিকট খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছেন প্রিয় লেখক। হৃদয়বিদারক ও স্পর্শকাতর গল্পের সমন্বয়ে সার্থক উপন্যাস সৃষ্টি হয়েছে। উপন্যাসের কাহিনিগুলো আমাদেরই গল্প। এ গল্পগুলো ভুলবার নয়, এ গল্প বারবার মনে করার, বারবার ভালবাসার, বারবার চোখের জলে ভেজার। গল্পটা মধ্যবিত্তের দিনযাপনের। এর কোথাও বিলাসিতা, প্রাচুর্যের ছাপ নেই। লেখক জাদুর লেখনীতে কল্পনা থেকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছেন ঘটনাপ্রবাহকে। মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেছেন একেকটি চরিত্র যা স্ব স্ব ক্ষেত্রে জাজ্বল্যমান। গভীর অনুভূতি, স্মৃতি ও আবেগের দখিন দুয়ার এবং বাস্তবিক দ্বিধা, সংশয় ও উপেক্ষা নিয়েই গড়িয়ে চলেছে উপন্যাস। উপন্যাসে প্রগাঢ়ভাবে ফুটে উঠেছে ইচ্ছাশক্তির প্রতি আস্থা, নিজস্ব স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, আপোষহীন মানুষের দৃঢ় প্রত্যয়, মেসজীবনের অব্যক্ত সত্য ও কষ্টের দিনযাপন, বহু কিছুর সম্ভাবনা বিবেচনা করে সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখার সুফল, পড়াশোনা শেষ করার পরও চাকুরিহীন হুমকিস্বরূপ বেকারত্ব জীবন এবং চোখের সামনে খসে-পড়া চেনা জগৎ ও পাল্টে যাওয়া সমুদয় হিসাব। এছাড়াও ফুটে উঠেছে অপূর্ব ভালোবাসা বুকে নিয়ে নীরবে ছুটে চলা অনন্য মানুষদের স্বচ্ছ জীবনকথা, বুকের অলিন্দে জমিয়ে রাখা কথা বলতে না পারার আক্ষেপ, বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রতি সমাজের তুচ্ছতাচ্ছিল্য, মানুষের সদয় মনোভাবের ফায়দা নিয়ে ক্ষতি করার চিন্তাধারা, সাদামাটা ব্যবহারের মানুষদের প্রকাশ না করা জীবন থেকে আড়াল করা নিষ্ঠুর গল্প। আরো তুলে ধরা হয়েছে বিপদে পড়ে সামান্য টাকার জন্য মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো মানুষদের গল্প, প্রিয়জনের অপেক্ষায় একজনম লেগে থাকা, দেশে ফেরার আকুলতা বুকে চেপে প্রবাসীদের অপ্রকাশ্য কষ্ট এবং প্রবাসীদের আশা বিসর্জনী একাকীত্ব জীবন। যান্ত্রিক ও প্রাকৃতিক স্বাদের পার্থক্য নিরূপণও করা হয়েছে দারুণভাবে। সুপ্রিয় লেখকের অনুভূতির প্রকাশভঙ্গী ভীষণ সুন্দর! কি দারুণ ভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আকাশ-বাতাস কিংবা গ্রাম্য মাধুর্যের বৈশিষ্ট্য নিজস্ব লিখনশৈলীর মাধ্যমে প্রকাশ করে অন্যের মনে ভিন্ন অনুভূতির সঞ্চার করেন। আমরা নিজেদের অবহেলার ফলে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলি কিন্তু একপর্যায়ে সেই হারানো জিনিসগুলোই আমাদের অনুতপ্ত করে, এই-ই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। 🟦 পর্যালোচনা : লেখকের জীবনবোধ নিয়ে চিন্তাশক্তি মুগ্ধ করার মতো। এমনকি বিষয়টি উপন্যাসেও ভিন্নমাত্রা এনেছে। লেখক পারস্পরিক অস্থিরতা ও ঘটনা দ্বারা পাঠককে প্রভাবিত করেছেন। অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে তুলে ধরেছেন সমাজ-রাষ্ট্রের বৈষম্য। লেখকের সরল স্বীকারোক্তিতে ফুটে উঠেছে মধ্যবিত্তদের জীবনচিত্র ও কাউকে কিছু বলতে না পারার অসহায়ত্ব। উপন্যাসের চরিত্রগুলো এত সাধারণ, এত বাস্তব, এত চেনা যে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর সাথে পাঠক হিসেবে মিশে যেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় না মোটেও। শব্দের ছোঁয়ায় বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। খুব সাধারণ কয়েকটি চরিত্র, সাধারণ তাদের জীবনযাপন, ঘটনা প্রবাহে তারা একে-অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাস্তবতার বুকে অঙ্কিত এই উপন্যাস খুব সহজেই আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। মোটা দাগে মধ্যবিত্তদের জীবন তুলে ধরলেও এখানে আপনি সবকিছুরই স্বাদ পাবেন। সবশেষে বলা যায় উপন্যাসটি কিছু পরিবারের হাসি-কান্না ও সুখ-দুঃখের গল্প। যেখানে আছে প্রবল আশা-আনন্দ এবং ব্যর্থতা-বঞ্চনা। এছাড়াও গ্রাম-গঞ্জ ছেড়ে কিছু সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীর শহুরে নিষ্ঠুর জীবনের প্রতিচ্ছবি ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম বিদ্যমান। জীবন কত বৈচিত্রময়, তার কিছু অসাধারণ চিত্র দেখার সুযোগ মিলবে এখানে। 🟦 পটভূমি : যদিও উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে যান্ত্রিকতায় আচ্ছাদিত ঢাকা শহরকে তবে মাঝে মাঝে টেনে নেওয়া হয়েছে গ্রামীণ কল্পনার জগতে। সমাজের সবকিছুই যেন লেখক সমকালীন প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের বিস্তর অংশ মধ্যবিত্তদের নিয়ে থাকলেও লেখক দরিদ্র কিংবা হতাশ্বাস মানুষদের কথাও ভীষণভাবে জানান দিয়েছেন। 🟦 গল্প বলা : একজন লেখক তখনই পরিপূর্ণভাবে উপন্যাস রচিতে সক্ষম হন যখন সমাজজীবন নিয়ে নিজের চিন্তাধারাগুলো সূক্ষ্মভাবে অন্যদের সামনে তুলে ধরতে পারেন। সেক্ষেত্রে ঔপন্যাসিকের গল্প বলার ধরণ বেশ মোহনীয় ছিল যা বিমোহিত করে ছাড়বেই যেকোনো পাঠককে। 🟦 বিন্যাস ও আখ্যানবস্তু বিশ্লেষণ (Setting and theme analysis) : যেকোনো উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্থাপন ও বিশ্লেষণ। অর্থাৎ উপন্যাসটি কবেকার, পরিবেশ, ঘটনাপ্রবাহ ও সময়। যা লেখকের দক্ষতায় গল্পের মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়। লেখক কোন এক বিশেষ সময়কে কেন্দ্র করে এগিয়ে গিয়েছেন উপন্যাসের শেষ অবধি। ঘটনাপ্রবাহ কিংবা পরিবেশ বর্ণনার ধারা অব্যহত রাখার কর্মে লেখক দারুণ পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন। 🟦 চরিত্র উন্নয়ন, সাহিত্য উপকরণ ও চরিত্র প্রবাহ/চাপ (Character development, literary tools and character arc) : উপন্যাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চরিত্রের উন্নয়ন। উপন্যাসে কোন্ চরিত্রের সাথে কোন্ নাম দিলে ভালো হবে কিংবা পাঠককে কোন ধরনের নাম বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিমোহিত করবে - এ বিষয়গুলো নিয়ে লেখককে অনেক ভাবতে হয়। কোনো চরিত্রের কর্মদক্ষতার সাথে মিল রেখে নাম দেওয়াই হলো লেখকের দক্ষতা। এই দক্ষতা পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে খুব কম লেখককেই দেখা যায়। এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো পেশার সাথে মিল রেখেই নামকরণ করা হয়েছে। নাম স্থাপনের প্রভাব খুব সুন্দররূপে উপন্যাসেও পড়েছে। উপন্যাসকে সুন্দরভাবে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে লিট্যারেরি টুলসের সঠিক ব্যবহার অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ উপন্যাসে সাহিত্য সরঞ্জামের ব্যবহার যথাযথ হয়েছে। লিট্যারেরি টুলস হিসেবে 'রূপক' ও 'উপমা' খুব ঘন ঘন ব্যবহার করা হয়েছে। 'রূপক' ও 'উপমা' ব্যবহারে লেখকের সৃজনশীলতা শতভাগ। গল্প এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের যে ক্রমপরিবর্তন হয় তাকে বলা হয় ক্যারেক্টার আর্ক। উপন্যাসটি দীর্ঘ সময় ধরে চলমান ছিলো এবং চলমান সেই সময়ের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলেও লেখক বেশ দারুণভাবে চরিত্রসমূহের বৈশিষ্ট্যের ক্রমপরিবর্তন তুলে ধরেছেন। 🟦 উপন্যাসের আখ্যান, শুরু ও শেষ : ' চন্দন গন্ধের বন ' উপন্যাসের আখ্যান বেশ সাজানো-গোছানো। উপন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠার লেখা অত্যন্ত চমৎকার, কাহিনি এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পড়ার প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনরকম একঘেয়েমি পীড়ন পোহাতে হয়নি। লেখক শেষটাও টেনেছেন ভীষণ চমৎকারভাবে। প্রথম দিকে ধীর গতিতে এগিয়ে চলা উপন্যাস শেষে গিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্রমপরিবর্তিত হয়েছে। 🟦 পছন্দনীয় দিক : লেখকের উপলব্ধি ক্ষমতা দারুণ। তাঁর উপলব্ধিতে সবসময় দুঃখী মানুষদের দিন পঞ্জিকা থাকে। ❝ নিম্নবিত্ত ছোট জীবনের কত ইচ্ছেই তো পূরণ হয়না, ঢোঁক গিলে চালান দিতে হয় বুকের অতলে। ❞ মানুষের মন পড়ার সক্ষমতাও লেখকের মধ্যে বেশ রয়েছে। দেশের বাহিরে থাকা মানুষদের মনের কথা কত নিপুণভাবে সাজিয়ে তোলেন। ❝ মাস শেষে যে মানুষটার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকায় এদের সংসার চলে, যে নিজে না খেয়ে সন্তানের মঙ্গলের জন্য পড়ে থাকে পরবাসে, সে-ই তো বাবা। ❞ জাগতিক ভালোবাসা কিংবা আবেগ নিয়ে লেখকের ভাবনাগুলো অতুলনীয়। ❝ এ শহর অভিমান-টভিমান বোঝে না, শুধু মানুষের মন ভাঙ্গতে জানে। আর তাই অভিমান করে কোন লাভ নেই। ❞ ❝ জীবনে কত মানুষ এসেছে, আরও কত মানুষ আসবে, তবুও প্রথম অভিজ্ঞতাগুলো কেউ দখলে নিতে পারবে না। ওরা আমৃত্যু প্রথমেই থেকে যাবে। হয়তো আরও অজস্র স্মৃতি তৈরি হবে, হবে নতুন অভিজ্ঞতাও। তবু প্রথমের ভালোলাগায় কেউ ভাগ বসাতে পারবে না। কেননা, জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথে যে বা যারাই সঙ্গ দেয়, তাদের প্রত্যেকেই অনুভূতির দেয়ালে নিজস্ব কিছু নকশা এঁকে যায়। ❞ এককথায় লেখকের পক্ক হাতের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লেখায় প্রান্তিক মানুষের নিয়ত সংগ্রাম ও উঠে আসা বারোয়ারি উপলব্ধিতে ঠাসা মোহান্ধ জীবনের গল্পই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি। 🔸 উপন্যাসটি শেষ হবার সাথে সাথে হৃদয়ের গভীরে বেশ ব্যথা অনুভব করেছিলাম। উপন্যাসের শেষটা স্তম্ভিত হওয়ার মতো এবং আমার বুকের মাঝে চাপা কষ্টের সৃষ্টি করেছিল। মন ছুঁয়ে যাওয়া উপন্যাসটি পড়লে আপনিও মায়ায় জড়িয়ে যাবেন অরণ্যের চন্দন গন্ধের বনের। ❝ বই পড়ুন, নিজেকে আলোকিত হিসেবে মানুষ গড়ে তুলুন। ❞ - রফিকুজ্জামান আকিব - ৭ম শ্রেণি, খুলনা জিলা স্কুল, খুলনা

Nishat Kader
Nishat Kader ভেরিফাইড
12 Jun 2023

#ইমরানেরগল্পকথাবুকরিভিউপ্রতিযোগিতা চন্দন গন্ধের বনঃ এক মধ্যবিত্ত জীবনের নানা রঙের গল্প “বলি বলি করে তবু বলা হলো না, জানিনা কিসের এত দ্বন্দ্ব” এই বই নিয়ে রিভিউ লিখতে গেলে প্রথমেই বাংলা সিনেমার এই কালজয়ী গানের কথা মনে হবে। কারন এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অরণ্য, রায়াকে মনে মনে ভালবাসলেও বলতে পারেনা কখনোই। রায়া তার কাছে হৃদয়ের সব কথা উজাড় করে দেওয়ার মানুষ, তার কোন নেগেটিভ দিকই ধরা পড়েনা অরণ্যের কাছে, কিন্তু তাও সে ঐ জাদুকরী কথাটা বলতে পারেনা। এর পিছনে কি কাজ করে? মধ্যবিত্ত ঘরের বড় ছেলের দ্বায়িত্ববোধ থেকে সৃষ্ট দ্বিধা, নাকি অন্যকিছু- সেটা আর জানা হয়না, উপন্যাস শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এ যেন রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মতো, “ শেষ হইয়াও হইলো না শেষ”। যাই হোক, উপন্যাসে ফিরি। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে এভাবে, “তোপখানা রোডে সন্ধ্যা নামছে, বিষণ্ণতার শামিয়ানায় ঢাকা সন্ধ্যা”- লাইনটি এমন, যা পাঠককে আকর্ষণ করে এবং টেনে নিয়ে যায় উপন্যাসের ভিতরে। সেখানে আমরা দেখি মফঃস্বল থেকে আসা কিছু মানুষের আখ্যান। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অরণ্য আলু দিয়ে কলিজা রান্না করবে, এমন সময় তার বন্ধু রাফির ফোন। মেস- হোস্টেলের বুয়া বা খালাদের রান্নার অবস্থা ফুটে উঠেছে এই সংলাপে, “বুয়ার রান্নায় পেট ভরলেও মন ভরেনা। অরণ্য যেদিন রান্না করে, সেদিন সবারই মায়ের কথা মনে পড়ে, মন ভরে খায়। যত বেশি চালই চড়াক চুলোয়, হাড়ির ভাতে কম পড়ে যায়” – এমন হৃদয় ছোঁয়া বর্ণনা লেখকের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। এই অরণ্য ঢাবির ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগ থেকে লেখাপড়া শেষ করেছে। তবে অন্যরা যেখানে বিসিএস নামের সোনার হরিণের পিছনে ছুটছে, সেখানে অরণ্য স্বপ্ন দেখে বিদেশে উচ্চশিক্ষার। Out of The Box চিন্তার জন্য তাকে ধন্যবাদ দেওয়াই যায়। লেখালেখির সূত্রে তার জীবনে আসে ডেন্টাল কলেজের ছাত্রী জুয়াই রিয়াতুল জান্নাত রায়া। এই অরণ্যকে আমরা এ যুগের প্রেক্ষিতে অনেকটা ব্যাকডেটেড বলতেই পারি, কারন তার কাছে ফেসবুকের ভার্চুয়াল দুনিয়ার থেকে মুখোমুখি বসে কথা বলার গুরুত্ব বেশি- আশ্চর্য বৈকি। এই রায়ার সাথে পদে পদে অরণ্যের মান অভিমানের পালা চলেছে। সবসময় যেন তার জীবনে রায়ার অবস্থান নিয়ে সে দ্বিধাগ্রস্থ। এমনকি মিলি আপার ফ্ল্যাটে রায়া যখন তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলো, তখনও সে বলতে পারেনি তার মনের কথা। মাপা মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বিধাই কি এর কারন? অরণ্যের বন্ধু রাফি তার বিপরীত স্বভাবের। শান্ত, ধীরস্থির অরণ্যের একদম উলটো হচ্ছে রাফি। যার কথাই হচ্ছে জীবনে প্রচুর রিস্ক নিতে হবে। সে আগপিছ না ভেবে একটা কাজ করে আর অরণ্যের কাছে এসে সাহায্য চায়, বিপদ থেকে বাঁচতে। রাফি শায়লাকে নিয়ে রুমডেটে গিয়ে বিশাল হাঙ্গামা বাধিয়ে ফেলে, কিন্তু মার খেলেও শায়লাকে ফেলে পালায় না। অরণ্যের পরিচিত ছাত্রনেতা জাহিদ ভাই তাদের এযাত্রায় উদ্ধার করেন, কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় তিনি শায়লার পরিস্থিতির সুযোগ পূর্ণমাত্রায় নিয়ে কেটে পড়েছেন। শায়লা একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে প্রথমবার যখন এমন সমস্যা হয় রাফির সাথে একান্তে সময় কাটাতে গিয়ে। কিন্ত পরবর্তীতে শায়লা যখন গর্ভবতী হয়ে যায়, তখন তাকে রাফি ছেড়ে কাপুরুষের মতো পালায় না, বরঞ্চ শক্ত করে তার হাত ধরে রাখে, তার পাশে থাকে এমনকি বাচ্চাটা তার নয়, সেটা জানার পরেও। লেখকের ভাষায়, “ভুল করলে ছেড়ে তো সবাই যেতে পারে, কিন্ত ভুল শুধরে পাশে থাকার মানুষ কোথায়”- হ্যা, রাফি ছিলো পাশে, জগতের সব পুরুষ স্বার্থপর না, সেটা সে প্রমাণ করেছিলো শায়লার চরম বিপদের দিনে। এহেন শান্তশিষ্ট স্বভাবের অরণ্যের বাবা সৌদি প্রবাসী, গত বিশ বছর ধরে। লেখকের এক লাইনেই প্রবাসজীবনের সারমর্ম উঠে এসেছে চমৎকারভাবে। “বিশ বছর ধরে মানুষটা প্রবাসে, স্ত্রী সন্তান ছাড়া অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গ জীবন” এই লাইন পড়ে আপনার প্রবাসী আত্নীয়ের কথা মনে পড়বেই এবং চোখ ভিজে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। প্রবাসীদের ঈদ উদযাপনের যে করুণ চিত্র দেওয়া হয়েছে, সেটিও আপনার চোখ ভিজিয়ে দেবে, আপনি যদি একটু নরম মনের মানুষ হন। অরণ্যের একটা ছোট বোন আছে, তার বিয়ে দিয়ে এবং অরণ্যের একটা চাকরি হলেই তার প্রবাসী বাবা দেশে ফিরতে পারেন। তাই অরণ্য একবার IELTS এ কাঙ্খিত স্কোর তুলতে না পেরে আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে এক কনসাল্টিং ফার্ম ঘুরে তার উপলদ্ধি, সুন্দরী অফিসারদের বসিয়ে রাখা যতটা না নারীর ক্ষমতায়নের জন্য, তার থেকে বেশি এর পিছনে কাজ করে ব্যবসায়িক বুদ্ধি। অরণ্যের বাবা অনেকটা হাপিয়ে উঠেছেন প্রবাসে থাকতে থাকতে, বাবার ভালোবাসা কি জিনিস, সেটা অরণ্য আর তার বোন অদিতি বোঝেনি। তাদের কাছে বাবা মানে ফোনে ভেসে আসা শব্দ আর তার স্ত্রীর কাছে মাস গেলেই ত্রিশ হাজার টাকা। ভালোবাসার কি টান- ১০ বছর আগে তার স্বামীর দেওয়া শাড়িটাই তিনি পরেন, ছেলের দেওয়া শাড়ি নয়। কিন্ত বুকে পাথর বেঁধে স্বামীকে থেকে যেতে বলেন প্রবাসে, কারন তা না হলে মাস গেলে ত্রিশ হাজার টাকার সংস্থান কিভাবে হবে? বাস্তবতার কাছে আবেগের পরাজয় ঘটে এভাবেই। অরণ্য কিছুটা বাবার চাপাচাপিতে আর ইংলিশ অনুশীলনের জন্য এক বায়িং হাউজে চাকরি নেয়। কিন্তু যত দিন যায়, তত তার বস জহিরুল ইসলামের ব্যবহার খারাপ হয়। তবুও অরণ্য মা বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে সহ্য করে। লেখকের ভাষায়, “এত পিছুটান থাকলে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানো যায় না” তবে অরণ্য একপ্রকার অসহ্য হয়ে একদিন চাকরি ছেড়ে দেয়, যখন তার এডুকেশন লোন মোটামুটি পাশ হয়ে যাবে এমন অবস্থা। তার দুদিন পরই তার প্রাক্তন বস জহিরুল পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়, আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানকারী চক্রের প্রধান হিসেবে, সাথে তার পিএ নাজনীন, যাকে নিয়ে বিভিন্ন মিটিং এ যায় জহিরুল এবং সঙ্গে করে বিদেশেও নিয়ে যায় এবং যার জন্যে জহিরুলের সংসারে অশান্তি চরমে ওঠে। এই উপন্যাসের আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক- মানুষের চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশ্লেষণ। ঠিক যেমন এক মানুষের ভেতর ডক্টর জেকিলের মত ভদ্র আর মিস্টার হাইডের মতো দাগী অপরাধী বাস করে, তেমনি সাধারন মানুষকে সহজেই জাজ করা উচিৎ নয়। তার আপাতদৃষ্টিতে খারাপ কাজের পেছনে হয়তো আছে কোন অনিবার্য কারন। যেমন- মিলি আপা রুমডেটের জন্য ছেলেমেয়েদের রুম ভাড়া দেন- এটুকু শুনে যদি ভাবেন তিনি খারাপ, তাহলে শুনে রাখুন, তার স্বামী তাকে ছেড়ে গেছে, ভালোবেসেছিলেন তিনি মানুষটাকে এবং তার অটিস্টিক বাচ্চার চিকিৎসার খরচ পর্যন্ত দেন না ঐ বাবা!- এখন আপনি মিলিকে খারাপ বলবেন কিনা, সেটা আপনার ব্যাপার। আবার জহিরুল ইসলামের সাথে দেশে বিদেশে যাওয়া নাজনীন- তাকে আপনি খারাপ বা অপরাধী ভাবতেই পারেন, কিন্ত অরণ্য চাকুরী ছেড়ে আসার সময় তার বলা কথাগুলো শুনেও ভাববেন কিনা সেটা আপনার ব্যাপার, কারন তখন সে বলেছিলো, মায়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে সে এই চাকরি করে এবং অন্য কিছু পেলে এটা ছেড়ে দেবে, কারন এটা ভালো লাগেনা, বাধ্য হয়ে করে সে, নাহলে যে রাস্তায় দাড়াতে হবে! মুদ্রার অপরপিঠে আছে মাজেদা খালার মতো মানুষেরা, যারা স্বামী পঙ্গু যেনেও তার কাছেই থাকেন, তিনি চলে গেলে তার পঙ্গু স্বামীকে কে দেখবে, শুধু সেই চিন্তা করে এবং অরণ্যের কাছে হুইলচেয়ার চেয়ে বসেন অনেক সংকোচের পর। এই মাজেদা খালার গল্প শুনলে মনে হয়, নিঃস্বার্থ, খাঁটি ভালোবাসা এখনো পৃথিবীতে আছে, তা সে যতই বিরল হোক না কেন। অরণ্যের জীবন থেকে দুজন মানুষ হারিয়ে যায়, তার ছেলেবেলার নায়ক সুফিয়ান মামা আর ঘটনাচক্রে পরিচয় হওয়া এক মেয়ে দিশা। তার ছেলেবেলার নায়ক সুফিয়ান মামার হারিয়ে যাওয়া এক ট্র্যাজেডি। তিনি ব্যবসায় করতে চেয়েছিলেন, পড়াশোনা করে চাকুরির গৎবাঁধা জীবন তার পছন্দ ছিলোনা। কিন্ত তার বাবার ছিলো অন্য ইচ্ছা। তাই তিনি ব্যবসায়ের প্রাথমিক পুঁজিও ছেলেকে দেন নি। ছেলের প্রেমও মেনে নেন নি। প্রতিবাদে ছেলে বাবার সাথে ঝগড়া করে এক বুক অভিমান নিয়ে ঘর ছাড়ে, আর সে ঘরে ফেরেনি। ১৩ বছর পর তার লাশ পাওয়া যায় ঢাকা মেডিকেলের মর্গে, সেই রায়ার সহায়তায়। বাড়ি ছাড়ার আগে অরণ্যকে বলে যাওয়া তার কথা এখনও কানে বাজে- “ ভালোবাসার চাইতে বড় পাপ জগতে আর নাই” বাবা মায়েরা যদি একটু সন্তানদের স্বপ্নকে, ভালোবাসাকে মূল্য দিতেন, তাহলে হয়তো এরকম মৃত্যু দেখা লাগতো না। সুফিয়ান মামার খোঁজ করতে শখের বাইক নিয়ে পুরো ঢাকা ঘুরেছে অরণ্য, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর এক প্রতারকের খপ্পরে পড়ে আগেই বুঝে ৫০০০ টাকা খোয়ানো থেকে বেঁচেছে। সমাজের আরেক অন্ধকার দিক- মানুষের আবেগ নিয়ে প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যখন মায়ের মৃত্যুর কথা বলে প্রতারণার কথা বলেছেন লেখক। এদিকে দিশার সাথে অরণ্যের পরিচয় এক পত্রিকায় লেখার প্রতিক্রিয়া থেকে। সে এক বিরাট ট্র্যাজিক কাহিনী ফেঁদে বসে, কিন্ত শেষে স্বীকার করতে বাধ্য হয় পাত্তা পাবার জন্য এরকম মিথ্যা কাহিনী ফাঁদার কথা। এই দিশার প্রতারণা যেন মাজেদা খালার ভালোবাসার কয়েনের আরেক পিঠ। এই দিশার খোঁজে টাঙ্গাইল যায় রায়া ও অরণ্য, কিন্ত বিফল মনোরথে ফিরতে হয় তাদের। বিপদ আরো বাড়ে যখন রায়া বাসে উঠতে পারেনা ভিড়ের জন্য। এমন সময় অরণ্য আর রাফি হাজির হয় গাড়ি নিয়ে এবং রায়াকে মুক্তাগাছা পৌঁছে দিয়ে নিজেরা ঈদের দিন ভোর পাঁচটায় বাড়ি পৌছায়। এই অংশটুকু একেবারে সিনেমা বা রুপকথার মতো লেগেছে, যেন বিপদে পড়া রাজকন্যাকে উদ্ধারে এগিয়ে এসেছে বীর রাজকুমার। রায়ার সিনেমাপ্রেমিক বন্ধু যেমন বলেছে, “ জীবনটা একটা বিরাট সিনেমা, কিন্তু সেখানে কোন স্ক্রিপ্ট থাকেনা" রায়াকে ঝোঁকের বশে লুকিয়ে দেখে তার অনুরোধ না শুনে অরণ্যর পালিয়ে আসার কারন কি?- দ্বিধাই হবে হয়তো। আরেকবার চাঁদরাতে আড্ডা দিতে দিতে পরেরদিন বাসের ছাদে উঠে অরণ্যর নানার বাড়ি পৌঁছানোর কাহিনী কম রোমাঞ্চকর নয়। এই উপন্যাসে ঢাকা শহরের চিত্র বর্ণিত আছে শিল্পীর কলমে, তেমনি আছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গল্প, যা আমাদের মত ৯০ দশকের মানুষদের নস্টালজিক করার জন্য যথেষ্ট। অরণ্যের মাজেদা খালার আবদারের হুইল চেয়ার কেনার ব্যাপারটা আর টাকা যোগাড়ের জন্য বাবার জমি বিক্রির অনুরোধে না বলার চিত্রটা প্রতিটা মধ্যবিত্ত ঘরের ছবি। মধ্যবিত্ত মা কিভাবে নিজের শখ বিসর্জন দিয়ে ছেলেমেয়েদের বড় করেন সেটাও সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। অরণ্যের কোচিং এর সহপাঠী জিনিয়ার কথায়, “তোমাদের কাছে একদিনের আনন্দের যা মূল্য, তা দিয়ে আমার মাস চলতে হয়”- এটাই মধ্যবিত্তদের বাস্তব, যতই রুক্ষ শোনাক না কেন। অরণ্য- রায়ার বাইক রাইড, কাঠবাদাম রেস্টুরেন্টে যাওয়া আর শর্মা হাউজে প্রথম দেখার মুহূর্তগুলো মনে রাখার মতো। যদিও রায়া শেষে বলে যে শে তার প্রথম প্রেম আশফাককে এখনো ভুলতে পারেনি এবং তার সময় প্রয়োজন। মধুরেণ সমপায়েত পুরোপুরি হলো না, তাও লেখক সার্থক, মধ্যবিত্ত জীবন ফুটিয়ে তুলতে। কারন আমাদের জীবনে সব সমীকরণ সব সময় মেলে না।

Review Upload 1
Review Upload 2
8801860412961
8801860412961 ভেরিফাইড
11 Jun 2023

#ইমরানেরগল্পকথারবুকরিভিউপ্রতিযোগিতা উপন্যাস: চন্দন গন্ধের বন। লেখক: আব্দুল্লাহ আল ইমরান। জনরা: সমকালীন। 'চন্দন গন্ধের বন' শিরোনামের মধ্যেই কেমন যেন এক অদ্ভুত ভালোলাগার স্পর্শ লুকিয়ে আছে। হেমন্তের জোছনা পুলকিত যামিনীতে ধূসর প্রকৃতির সিঁড়ি ভেঙ্গে নির্জনতার স্নিগ্ধ কোল ঘেঁষে চন্দনবনে লুটিয়ে পড়া সোনালি চাঁদের আলো যেমন অনিন্দ্য মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায় ধরণী মাঝে, তেমনি এক নির্মল ভালোলাগার আবেশ জড়িয়ে আছে এই উপন্যাসের নামের মধ্যে। যা আমাকে বইটির প্রতি আকর্ষিত করেছে। এটি লেখকের এক চমৎকার রুচিবোধের পরিচয় বহন করে। সেই সাথে প্রচ্ছদের চমৎকার দৃশ্যকল্প যেন সুস্বাদু সালুনে আরেকটু বাড়তি মোসলা যোগ করে দিয়েছে! যা বইটির প্রতি পাঠকের ঝোঁক অনায়াসে বাড়িয়ে দেবে। চলুন এবার উপন্যাসের মূল গল্পের উপর একটু ফোকাস দেওয়া যাক... গল্পটা মোটামুটি সাদামাটা। আমাদের চেনাপরিচিত কিছু কাহিনী নিয়েই কসমোপলিটান গল্পের চরিত্রগুলো নির্বাণ স্রোতস্বিনীর মত ধীর লয়ে এগিয়ে গিয়েছে চূড়ান্ত ক্লাইমেক্সের দিকে। তবে সাদামাটা হলেও প্লটের উপস্থাপনায় লেখকের মুন্সিয়ানা দেখানোর চেষ্টা অব্যাহত ছিল বেশ। যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। উপন্যাসের মূল গল্প রচিত হয়েছে #অরণ্য' এবং #রায়া' নামক দুটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে। যারা এই উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট এবং কনডাকট্রেস। গল্পের পথ ধরে এগুতে গিয়ে লেখক আরো কয়েকটি সাব-প্লটের আশ্রয় নিয়েছেন। যে রীতি বাংলাসাহিত্যর ইতিহাসে বহুকাল আগ থেকেই চর্চিত হয়ে আসছে। এবং এ ধারাটি বেশ জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছে। ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে বাংলাসাহিত্যর শুভ্র নীলাম্বরে যে সকল লেখক সাহিত্যিকগণ তেজোদীপ্ত সূর্যরশ্মির মত আলোর দ্যুতি ছড়িয়েছে দিগ্বিদিক তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং শরৎচন্দ্র অন্যতম। আরো অনেকে আছেন তাদের রেফারেন্স এখানে আপাদত টানছি না। এদের মধ্যে বাংলাসাহিত্যর উপন্যাসের দিক দিয়ে জনপ্রিয়তায় একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যার কোন উপন্যাস পাঠ করতে বসলে এক বৈঠকেই ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মত একনিষ্ঠ চিত্তে পুরো শিকারটাকেই গিলে ফেলতে পারাটা বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার। তাঁর উপন্যাস লেখনীর হাত এতোটাই ঋদ্ধ ছিল যে পাঠক মোহাবিষ্ট হয়ে সাবকন্সিয়াসলি একের পর এক পাতা উল্টে যেত! শরৎবাবুর উদাহরণটা এই জন্য টানলাম যে, এই উপন্যাসের লেখক আব্দুল্লাহ আল ইমরান তাঁর লেখনীর মধ্যে দিয়ে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখার এবং গল্পের প্রতিটি মোঁড়ে যে একেকটি ট্যুয়িস্ট রেখে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তা অবলিলায় প্রশংসনীয়। এবং এই প্রচেষ্টায় তিনি পুরোদমে সফল না হলেও কিছুটা সফল হয়েছেন বলাই যায়। এবং সময়ের সাথে সাথে তাঁর লেখনীর হাত যে আরো অনেক শানিত হবে এই ইঙ্গিত তাঁর লেখনীর মধ্যে দিয়ে পাওয়া যায়। উপন্যাসের একদম শুরুর দিকটাতে তোপখানা রোডে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার যে চমৎকার বর্ণনাটা দিয়েছেন, সেই সাথে প্রকৃতির নিগূঢ় রূপ রসের ক্যানভাসে নিখুঁত রঙ তুলির আঁচরে অরণ্যর হারিয়ে যাওয়া দুরন্ত শৈশবের যে মনোমুগ্ধকর চিত্র অঙ্কন করেছেন আপন মনে; তা আমাদের প্রায় সকলেরই শৈশবের স্মৃতিতে নতুন করে দাগ কেটে যায়! যা যেকোন সাহিত্যপ্রেমি পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে বাধ্য! #রাফি' উপন্যাসের নায়ক অরণ্যর বন্ধু। #শায়লা নামের একটি মেয়ের সাথে রিরংসার উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে সে অরণ্যর সাহায্য কামনা করে। কিন্তু অরণ্য এ ব্যাপারে তেমন কোন সাহায্য করতে না পারায় অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে রাফি তাঁর তথাকথিত ভার্সিটির বড় ভাই খসরু এর রেফারেন্সে বিজয়নগরে এক অচেনা আপুর বাসায় উঠে রুম ডেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। আর যেখানে আমরা #মিলি আপু নামক উপন্যাসের অন্যতম চরিত্রের সাথে পরিচিত হই। যার একটি অটিস্টিক বাচ্চা আছে স্বামী নেই। কিন্তু সেদিন মিলি আপুর ছোট ভাই হঠাৎ করে বাসায় চলে এলে রাফি তার কামবাসনা চরিতার্থ করতে ব্যর্থ হয় । বিছানায় পরিপূর্ণ পারফরমেন্স করতে না পারার চাপা কষ্টে তার অন্তরের অভ্যন্তরে কামনার ছাইচাপা আগুন আরো তীব্র বেগে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। যে অপূর্ণতার আগুন তাকে ফের শায়লার দ্বারস্থ করে নয়া পল্টনের আবাসিক হোটেলে। কিন্তু এখানেও তাঁকে বেশ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়তে হয়! পরবর্তীতে সরকারি দলের কেন্দ্রিয় ছাত্রনেতা দেবদূত #জাহিদকে অরণ্য বিষয়টি অবগত করলে তাঁর সহযোগীতায় এই গুমট পরিস্থিতি থেকে তাঁরা বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয়। অনেক ঘটনার জন্মদিয়ে একটা সময় শোনা যায় শায়লা প্রেগন্যান্ট! কিন্তু রাফির জোড় বক্তব্য, এই অনাগত সন্তানের পিতা রাফি নয়! তাহলে কে এই অনাগত সন্তানের পিতা? রাফি কেন'ই বা শায়লার সন্তানকে অস্বীকার করলো? এর পেছনে নাটের গুরুই বা কে.? শায়লার সাথে শেষ পর্যন্ত কি ঘটেছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে আপনাকে এই উপন্যাসটি পড়তে হবে। এদিকে অরণ্যর সাথে রায়ার পরিচয় হয় অরণ্যর লেখনীর মাধ্যমে। ব্লগে লেখালেখি ভালোলাগার বদৌলতে রায়া অরণ্যকে অনলাইনে খুঁজে বের করে এবং দীর্ঘ মেসেজে তার লেখনীর ভূয়সী প্রশংসা করে। একটা সময় অরণ্যর ও ভালোলেগে যায় মেডিক্যালের ছাত্রী রায়াকে। অবশেষে ফোন নম্বর বিনিময়ের মাধ্যমে শুরু হয় তাদের যুগল প্রেমের পথচলা! কিন্তু কেউ কাউকে মনের কথা খোলসা করে বলতে পারে না। কিন্তু দুজনের মধ্যে মিউচুয়াল রোমান্টিক আলাপচারিতার মাধ্যমে গল্প এগিয়ে যায় আপন গতিতে। অরণ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় তার দেখা পৃথিবীর সাথে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের চিন্তাচেতনা ও দায়িত্ববোধের ব্যাপারটা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তার জীবনের আপস এন্ড ডাউন আমাদের ভেতরটাকেও নাড়িয়ে যায়। সে কখনো ভাবে ILTS করে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাবে। তার মা #শেফালী খাতুন এবং বাবা #ফয়জুল মুন্সিও তাই চায়। কিন্তু এর জন্য অরণ্য তার বাবার জমিজমা বিক্রির বিষয়টাকে মানতে পারে না। ফলে সে ঢাকাতেই একটি বায়িং হাউজে চাকরি নেয় যেখানে অরণ্যর পরিচয় হয় তার বস #জহিরুল এবং সহকর্মী #নাজনীনের সাথে। এই উপন্যাসে যাদেরকে অনেকটা খলনায়ক এবং খলনায়িকার ভূমিকাতেই লেখক উপস্থাপন করেছে। চাকরির এক পর্যায়ে অরণ্য বুঝতে পারে এই চাকরিটা আসলে তাঁর জন্য নয়। ফলে সে চাকরিটা ছেড়ে দেয়। এবং এটা যে অরণ্যর বেশ ভালো একটি সিদ্ধান্ত ছিল সেটা সে উপলব্ধি করতে পারে যখন জহিরুল এবং নাজনীন তাদের কৃতকর্মের জন্য পুলিশের দ্বারা এরেস্ট হয়। এভাবেই অরণ্যর জীবনের নানান ঘটনা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে লেখক একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের জীবনের গ্রাফচিত্র অঙ্কন করেছেন। যেটা করতে গিয়ে লেখক দারুণ ছোট ছোট উপমার নৈপুণ্যতা দেখিয়েছেন। যেমন: " চালের কৌটায় মাপা হিসেবের জীবন। কড়ে গোনা আনন্দ।" কি নেই এ জীবনে? আছে হতাশা, আনন্দ, বেদনা, ভালোবাসা আছে অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করতে চাওয়ার একটি স্বচ্ছ মানবিক হৃদয়। যার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে অরণ্যর মেসের #মাজেদা খালার হুইল চেয়ার এবং মিলি আপুর অটিস্টিক বাচ্চার জন্য সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। অবশ্য অরণ্যর জীবনের উত্থান-পতন, উৎসাহ উদ্দীপনায় সর্বদাই তার পাশে থেকে প্রেরণা যুগিয়েছে রায়া। এসব দিক দিয়ে লেখক রাফিকেও সমান তালে এগিয়ে রেখেছেন। উপন্যাসের শুরু দিকে রাফির চরিত্রকে লেখক কিছুটা নড়বড়ে করে তুলে ধরলেও একটা সময় এসে পাঠক বুঝতে পারে সে আর যাই হোক নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষ নয়। অরণ্যর ছোট মামা #সুফিয়ানের দীর্ঘ বছর ধরে লাপাত্তা হওয়া এবং যাকে বিয়ে করতে না পারার চাপা কষ্ট নিয়ে সে ঘর ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছিল সেই #শিউলি বেগমের সাথে অনেক বছর বাদে অরণ্যর হঠাৎ দেখা এবং শিউলির মনের গহিনে সুফিয়ানের জন্য আজও লালিত গভীর ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ পরম যত্নে বানানো মাফলার; এই উপন্যাসে সত্যিকারের ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রেম যে অমর, প্রেম যে মানুষকে নতুন আশায় বুক বেঁধে বাঁচতে শেখায় সেটাই লেখক তার লেখনীর মধ্য দিয়ে দারুণভাবে ফুটিয়ে তু্লেছেন। উপন্যাসের শেষের দিকে অরণ্য অবশ্য তাঁর ছোট মামা সুফিয়ান কে খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। কিন্তু কিভাবে.? কোথায়.? কি অবস্থায়.? জীবিত না মৃত.? শিউলির পরম যত্নে বানানো মাফলারটা কি অরণ্য শেষপর্যন্ত সুফিয়ানের গলায় জড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল.? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে ঝটপট উপন্যাসটি পড়ে ফেলুন। #আশফাক, #মীরা এবং #দিশা এই চরিত্রগুলো উপন্যাসের মাইনর ক্যারেক্টার। আশফাক কে রায়ার প্রাক্তন প্রেমিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। যে অনেকদিন পর আবারও রায়ার জীবনে ফিরতে চায় কিন্তু ততদিনে রায়ার ভেতরটা দখলে নিয়েছে অরণ্য। মীরা রায়ার বান্ধবি যে বাংলা মুভির বিরাট বড় ফ্যান। তার চরিত্রের মধ্যে দিয়ে আমরা বুঝতে পারি পুরোনো থেকে বর্তমান বাংলা ছায়াছবি সম্পর্কে লেখক সম্যক ধারণা রাখে। এবার আসি দিশার প্রসঙ্গে। আসলে এই উপন্যাসে দিশার উপস্থিতি এবং বক্তব্য পরিমানে বেশ অল্প হলেও সে পুরো উপন্যাস জুড়েই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে! পাঠের একটা সময় তাকে রায়ার প্রতিদ্বন্দ্বী বলেও মনে হবে। পুরো উপন্যাসে সুফিয়ান মামার মতই অরণ্য দিশাকেও হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। তবে তাকে ভালোবেসে নয়, মানবিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে। পরবর্তী সময়ে আমরা বুঝতে পারি অরণ্যকে সে ইচ্ছে করেই চরম মানুষিক অস্থিরতার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে তাকে অবহেলা করার প্রতিশোধের স্বাদ নিতে! তাঁর আসল রূপ বেড়িয়ে আসে শেষের দিকে যখন সুফিয়ান কে খুঁজে পায় অরণ্য, ঠিক ঐ সময়েই। অর্থাৎ এতো বছর ধরে অরণ্য যে দুজন মানুষকে পাগল হয়ে খুঁজেছে, একই দিনে একই সময়ে অরণ্য তাঁদের অস্তিত্বের সন্ধান পায়। পরপর দুটি ঘটনার আকস্মিকতায় অরণ্যর সাথে সাথে পাঠকরাও নিশ্চিত কিংকর্তব্যবিমূঢ় বনে চলে যাবেন! লেখক এখানে যেন মহাকাশ থেকে খসে পড়া দুটি পৃথক উল্কা পিন্ডকে একই সমুদ্রের জলরাশির মধ্যে পতিত করেছেন! তবে এই অংশটি বই থেকে বিস্তারিত না পাঠ করলে পরিপূর্ণ আকস্মিকতার স্বাদ পাওয়া যাবে না। এবার উপন্যাসের সবশেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। কি ভাবছেন.? পরিশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রায়া এবং অরণ্য কি এক হতে পেরেছিল.? ছুটন্ত বাইকের পেছনে বসে দুবাহুর বন্ধনে আবৃত করা অরণ্যকে রায়া কি সারা জীবনের জন্য নিজের জীবনের সাথে আবৃত করে নিতে পেরেছিল.? বাঁধতে পেরেছিল কি একটি ছোট্ট সুখের নীড়.? নাকি শেষপর্যন্ত দুজনের এক হবার দুটি পথ দু দিকে বেঁকে গেছে.? এই জানা অজানার আগ্রহ থেকে জন্ম নেওয়া প্রত্যাশার পারদটুকুর অনুসন্ধানের দায়িত্ব আপনাদের কাঁধেই অপর্ণ করে গেলাম। -----------------00-------------------

Nasrin Jahan
Nasrin Jahan ভেরিফাইড
10 Jun 2023

এ বনের প্রতিটি উজ্জ্বল প্রান্তে ছেয়ে গেছে চন্দন কাঠের গন্ধ। যেও না গো কেউ, সেই চন্দন গন্ধের বনে। যদি যেতে চাও , তবে বার বার রিক্ত মোহময় কন্ঠে আমি ব্যক্ত করছি, এ মায়া থেকে তুমি মুক্তি পাবে না। তোমার হৃদয়ে আকুলতা জাগাতে, এই বন যে তোমায় মোহগ্রস্ত করে আচ্ছন্ন করে রাখবে অপার্থিব মায়াবী রুপের মুখরতায় । মায়া বড্ড ভয়ানক জিনিস ! মানুষ যতই মহাপুরুষে রুপান্তরিত হোক না কেনো, মায়া নিবিড়ভাবে তার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে, কোনো এক বিপরীত হৃদয়কে, ভালোবাসতে বাধ্য করবেই। আবদুল্লাহ আল ইমরানের " চন্দন গন্ধের বন " বইটি পড়ার পর আমার হৃদয়ে এমন সব ভাবনা জেগেছিল যে, বইটিকে এক রাতে শেষ না করে আমি অন্য কাজ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছিলাম না। বইটির অন্তিম পাতায় আসার পর মনে এক প্রকার আফসোসই থেকে গেলো, কেনো এই আফসোস? বলতে পারেন? বইটির প্রতি যে কারণে আমার আফসোস,আবেগ, হতাশা কাজ করেছে তা বইটির ব্যবচ্ছেদ করে, বইটির ভিতরের প্রতিটি শব্দে হারিয়ে গিয়ে,তল্লাশি চালিয়ে রিভিউ এর মাধ্যমে আপনাদের সামনে ব্যক্ত করছি। ( বইটির অভ্যন্তরের কোনো কথা স্পয়লার এর খাতিরে ব্যক্ত না করলেও, আপনাদেরকে বোধগম্য করার যথাসাধ্য চেস্টা অব্যাহত রাখব) । ★ লেখক পরিচিত : সাংবাদিকতা পেশা যার সাহসিকতার বর্ননা দেয়, সমাজের প্রতিবাদী চরিত্রদের একজন তিনি। খুলনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা অঞ্চল ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান জীবন ও আশার তাগিদে। চ্যানেল ২৪ এর মেধাবী সাংবাদিকদের মাঝে তিনি অন্যতম। তার বেশিরভাগ লেখা জুড়েই থাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গ্রামীণ সমাজ,রাজনৈতিক অনাচার, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা ও সমাধানের মিশেল। ★ বইয়ের পরিচিতি : শিখা প্রকাশনী থেকে ২০২২ সালে প্রকাশিত, সমকালীন প্রেমের উপন্যাস, যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক,সামাজিকতা,অনাচার, ২০০৬-২০১৫ সালে কসমোপলিটান ঢাকা শহরে প্রেমের বহুমাত্রিক রূপ, কল্পজীবনের আশ্রয় নেয়া মানুষ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রেম সহ বিভিন্ন দিক বর্ননা দেয়। ★ গল্পের মূলভাব/ সংক্ষেপে গল্পের বিন্যাস : ♦ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করা ফেসবুকের নিয়মিত লেখক অরণ্যের প্রবল ইচ্ছে বিদেশে যাওয়ার। গ্রামীন শিকড়ের টান তাকে প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, কল্পনা জগতেই সবচেয়ে বেশি সময় সে বিচরণ করে। প্রেমিকার(শিউলি) ভালোবাসা ও তাকে না পাবার প্রবল অভিমানে অরণ্যের মামা পাড়ি জমান অজানা কোন দেশে, মামা সুফিয়ানকে খুঁজে বের করতে কোনো চেষ্টার অন্ত নেই তার । দিশা নামের মেয়েটির সাথে তার পরিচয় বেশিদিনের না হলেও, তার মায়ায় পড়ে যায় অরণ্য । মামার মত মেয়েটিও হারিয়ে যায় সময়ের প্রহসনে। ♦ রায়া ডেন্টাল মেডিকেলের ছাত্রী। অরণ্যের ফেসবুকের গল্পে মুগ্ধ হয়ে, রায়া পরিচিত হয় অরণ্যের সাথে। আবেগ,অভিমান,ঠাট্টা এই তিন এর মাধ্যমে তাদের সম্পর্ক ভালোই চলছিল। দীর্ঘ চার মাসের সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পরলেও, অরণ্যের সকল বিপদের সাথী এই মেয়েটি। অরণ্য আর রায়ার সম্পর্কের ব্যাপারটি কি আমরা ধরতে পারি , প্রেমে পরা বারণ নামক গানের একটি লাইনের মাধ্যমে। দুইটি হৃদয় চায় মিলিত হতে, তবে ভাগ্যের লিখন তো আর খন্ডানো যায়না, প্রেমের জটিল চক্রে হারিয়ে যেতে তাদের ইচ্ছে হলেও, তারা নিজেদের অনুভুতিকে ব্যক্ত করতে অনিচ্ছুক। ♦ শায়লা ও রাফি এই দুই মানিকজোড় যেনো সাসপেন্সে ভরপুর চরিত্র । পুরো গল্পকে এরা শ্বাসরুদ্ধকর বানানোর বেশ তাগিদ দিয়েছে। কেনো বললাম এই কথা ? এ ব্যাপারে জানতে হলে আপনাকেও পড়তে হবে বইটি। রিভিউ এর মাধ্যমে শুধু উপন্যাসের মান নিয়ে আলোচনা করা হবে। কথায় আছে, যে সয় সে রয়। অতএব, রিভিউটি পড়ে বইটি পড়বেন। তবেই পাবেন বইয়ের লুকায়িত রস আস্বাদন করার মজা। ★ পাঠ প্রতিক্রিয়া : অনেকগুলো রোমাঞ্চকর গল্পের মোড় আপনার মস্তিষ্কের নিউরনে বার বার প্রশ্নের ঝড় তুলবে। প্রশ্নের সমাধান করতে বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত হিপনোটাইজড হয়ে থাকতে হবে। গল্পের তুলে ধরা বাস্তবতার প্রতিটি ছাপ অতিমাত্রায় আপনার মনকে প্রভাবিত করবে, আপনি বলতে বাধ্য হবেন, বাহবা দিবেন লেখককে। আর বলবেন, আরে! আমার আপনার সবার জীবনেও তো এমন ঘটনা প্রত্যহ ঘটে। লেখক সিদ্ধহস্ত জাদুকরের মতো প্রতিটি অক্ষরে আপনাকে নিমজ্জিত করে রাখবে। লেখক তার উপন্যাসে আসল সারপ্রাইজটা গল্পের প্রতিটি মোড় উন্মোচন এর আগ পর্যন্ত অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখেন, যা আপনার আমার ধরে ফেলা বেশ কষ্টসাধ্য। এই দিক দিয়ে লেখককে হাজারো সেলাম। সমাজকে খোঁচা মারা, ব্যঙ্গ করা অনিয়ম নিয়ে, এই দিক দিয়ে লেখক সফল। রোমান্টিজমের বিস্ময়ে বিহ্বল করে, প্রেমময় হৃদয়ে বসন্ত জাগাতে লেখক বেশ সিদ্ধহস্ত বলাই চলে। ★চরিত্রায়ন,সংলাপ,লিখনশৈলী,বর্ণনাভঙ্গি, গল্পের প্লট: ★ আপাত দৃষ্টিতে গল্পের প্লট বেশ সাধারণ, এমনটা প্রথম দিকে আমার কাছে লেগেছিল। তবে যখন গল্পের অতল গহ্বরে ডুব দিলাম, তখন বুঝতে বাকি রইল না লেখক কত বড় বাজিকর। সাধারণ প্লটকে অসাধারণ করার ক্ষেত্রে লেখকের মুন্সিয়ানা বেশ মুগ্ধ করেছে। গল্পের প্লট হচ্ছে দ্য জুয়েল অফ লাইফ। একটা প্লটের মাধ্যমে পাঠক একটা গল্পের ধারণা পান। প্লট এর দিক দিয়ে লেখককে আমার বলতে হয়, এভাবে পাঠকদের হৃদয়ে বিস্ময় জাগাতে আপনার জুড়ি নেই। ★ নিঃশ্বাস যেমন মানব শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, চরিত্রায়ন হচ্ছে ঠিক তেমন। গল্পে যদি বিভিন্ন চরিত্রের মিশেল দেখা না যায়, প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে ভালোবাসা ও দ্বন্দ্ব ফুটে না উঠে, যদি পাঠকরা চরিত্রকে ভালোবাসতেই না পারে, তবে এর চাইতে ব্যর্থতার আর কিছু নেই। লেখককে আবারো ধন্যবাদ দিচ্ছি, তিনি চরিত্রের বেশ ভালো বিল্ড আপ করেছেন। ★ একটি শক্তিশালী সংলাপ একটি জীবনকে বদলে দিতে পারে। এ জগতে যে লেখক যত শক্তিশালী সংলাপ গল্পে দেখাতে পারে, তিনি পাঠক মনে তত বেশি জায়গা করে নিতে পারেন। উপন্যাসে বর্ণিত গল্পে চরিত্রের খাতিরে যে সংলাপগুলো আমি পড়েছি তা বেশ ভালো। তবে মাঝে মধ্যে একটা খাপছাড়া ভাব এসে পড়লেও,লেখক দক্ষ হস্তে তা পুষিয়ে দিয়েছেন। ★ কখনো আঞ্চলিক বাক্য, কখনো বা শুদ্ধ বাক্য। চরিত্রের খাতিরে লেখকের লিখনশৈলীতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চরিত্র অনুযায়ী যে আঞ্চলিক চরিত্রে, তার আঞ্চলিক সংলাপ,আর যে শহুরে বাবু, তার বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ ফুটিয়ে তোলা। যত বড় মাপেরই লেখক হোন না কেনো দেশে, এই দিক থেকে যদি সামান্য ভূল ত্রুটিও থাকে, তবে গল্পের বারোটা বাজতে দেরি হয় না। ' চন্দন গন্ধের বন " উপন্যাসে পার্ফেক্ট লিখনশৈলীর জন্য বইটি পড়তে আরো বেশি মনোমুগ্ধকর লেগেছে। ★ লেখক যা লেখেন তা যদি চোখের সামনে ভাসে, তবে তার চাইতে বেশি মোহনীয় গল্প পৃথিবীতে নেই। আমি যখন বইটি পড়তেছিলাম, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যাই হচ্ছে তা যেনো আমার সামনেই যেন হচ্ছে। ব্যাপারটা বেশ লেগেছে আমার কাছে। লেখককে অনুরোধ করব, তিনি যাতে হরর জনরার দিকেও একটু সুনজর দেন। ★ প্রচ্ছদ, বানান,টাইপিং এবং অন্যান্য : একটি বইয়ের যদি বেশিরভাগ দিক সুন্দর হয়, তবে লেখকের সাত খুন মাফ। এমনটা আমাদের অনেকের ধারণা হলেও লেখকের ভুলগুলো আমাদের ধরিয়ে দেওয়া উচিত। গল্পে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, এমন কেনো হলো। এরপর নিজস্ব যুক্তির মাধ্যমেই নিজেকে শান্ত করেছি। তবে আমাদের দেশে অনেক পাঠকই তিল থেকে তাল হলেই প্রশ্ন করে বসেন। তাদের জন্য আরেকটু মনোযোগী হলে ভালো হয়। প্রচ্ছদ খাপে খাপ, টাইপিং এ কিছু ভুল বিদ্যমান, এইদিকে আরেকটু সুনজর দিলে ভালো হয়। ★ উপসংহার : শেষ হয়েও হইল না শেষ, উক্তিটির মতো আমার হৃদয়েও গভীর আক্ষেপ জাগে তখনই যখন এত সুন্দর একটা বইয়ের শেষের পাতায় এসে পরি। তখন নিজেকে নিজেই বলি, আরো ধীরে ধীরে পড়া উচিত ছিল। তবে আমার আর দোষ কি? লেখক যদি এত সুন্দর করে একটা বইয়ের বিন্যাস করেন, তবে আমরা পড়তে বাধ্য। বই শেষ করার পর আমার জীবনে অনেক ঘটনা ঘটেছে,যা বার বার দেজা-ভ্যু এর মতো চক্রাকারে বইয়ের স্মৃতির মিনারে আমায় বার বার ঠাই দিয়েছে। আমার লেখায় কোনো ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সবার জন্য শুভ কামনা রইল। লেখকের জন্য রইল অনেক দোয়া ও ভালোবাসা। ★ বই পরিচিতি : বইয়ের নাম: চন্দন গন্ধের বন লেখক : আবদুল্লাহ আল ইমরান প্রচ্ছদ : সানজিদা তিন্নি মুদ্রিত মূল্য: ৪৬৫.০০ টাকা প্রকাশনি : শিখা প্রকাশনি

Rubaeid Kadir
Rubaeid Kadir ভেরিফাইড
10 Jun 2023

বইঃ চন্দন গন্দের বন লেখকঃআবদুল্লাহ আল ইমরান আসলে বুক রিভিউ কিভাবে দিতে হয় আমি ঠিক জানি না।আমার কাছে বুক রিভিউ অনেকটা ওই মনের ভাব প্রকাশের মত, যার নির্দিষ্ট কোনো সীমানা কিংবা গতানুগতিক কোনো রীতি নেই।সেভাবেই শুরু করছি।আশা করি ভালো লাগবে। লেখক এটি জেনে খুশি হবেন যে আমি তার গ্রামে বেড়ে ওঠা তারই শৈশবের এক প্রতিচ্ছবি।চন্দন গন্ধের বন বইটি সম্প্রতি পড়েছি।বইটিতে বর্ননা করা লেখকের স্মৃতি বিজড়িত চন্দনীমহল,সিমান্দার পাড়,শিববাড়ি মোড়,রুপসা ঘাট,গিলাতলা চিড়িয়াখানা,পাটের নৌকা,সাত রাস্তা কিংবা নিউমার্কেট সব যায়গুলোতেই আমার স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে আর প্রানবন্ত। বইটি যেকোনো একটি ঘটনা প্রবাহে এগিয়ে যায়নি।উপন্যাসটির মধ্যে রয়েছে বহুমুখীতা।প্রধান দুইটি চরিত্র অরণ্য এবং রায়া ছাড়াও ঘটনার প্রবাহমানতায় বিভিন্ন চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন লেখক।যা পুরো বইটিতে ভিন্নরকম রোমাঞ্চ যুক্ত করেছে। উপন্যাসের শুরুতেই লেখক তার শৈশবের স্মৃতি কাতর বর্ননা দিয়েছেন যা পাঠককে কল্পনায় সেসব যায়গার প্রতিবিম্ব তৈরিতে বাধ্য করবে। বইটিতে রায়া অরণ্য চরিত্রদুটির সাথে সাথে সবচেয়ে সক্রিয় চরিত্র হিসাবে দেখা যায় অরণ্যের বন্ধু রাফিকে।যার চরিত্রে পরোপকারীতাই বিশেষভাবে প্রকাশ পায়।ঘটনার শুরুতেই শায়লা নামের একটি মেয়ের সাথে রাফির রুমডেটের চাঞ্চল্যকর অভিযানের বর্ননা পাওয়া যায়।বাস্তবধর্মী লেখাটিতে প্রেমিক প্রেমিকার ঘনিষ্ঠ সময় কাটানোর সরল সুযোগ নিয়ে সমাজের কিছু নির্দিষ্ট শ্রেনীর লোকের ফায়দা লুটার যে পৈশাচিক মনোভাব তারও স্থান হয়েছে যথেষ্ট সাবলীল ভাবে।রুম ডেটের যাত্রাটা ভয়ংকর রুপ নিলেও এরই মধ্যে দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে মিলি আপু নামের এক ভদ্রমহিলার। যে কিনা সিংগেল প্যারেন্ট এবং আর সন্তানটি স্পেশাল চাইল্ড।পুরো লেখাটিতে রায়া এবং অরন্যের পরিচয়ের বিষয়টা সমসাময়িক পাঠকদের পক্ষে সহজেই রিলেট করা সম্ভব হবে।রায়া মূলত অরণ্যের লেখা পড়ে তার সাথে সোস্যাল মিডিয়ায় এড হয়।এরপর থেকে চলে তাদের নামহীন সম্পর্কের অধিকারহীন রাগ,অভিমান,জেদ।আস্তে আস্তে মুঠোফোনের বার্তাতেই তাদের সম্পর্কের পরিধি বিস্তার লাভ করতে থাকে।তাদের সংলাপের বেশিরভাগ জুড়েই থাকে সারাদিনের ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক বর্ননা থেকে শুরু করে তুচ্ছ দিনানিপাতও। অরণ্য,রায়া,রাফি কিংবা মিলি আপু বাদেও এই গল্পে আরো কিছু খণ্ডকালীন চরিত্রের দেখা মেলে যারা একেক সময় পুরো উপন্যাসটিতে বিভিন্ন মোড় এনে দিয়েছে। তেমনই একটি চরিত্র দিশা।রায়ার মতো করেই পরিচিত হওয়া দিশা নামের মেয়েটির সাথে অরণ্যের একটি অদৃশ্য কিন্তু গভীর সম্পর্ক তৈরী হয়।তবে এই সম্পর্কের গভীরতা অরণ্য উপলব্ধি করতে পারে যখন দিশা নামের মেয়েটি অরণ্যের থেকে তার দেওয়া অনুভূতির পর্যাপ্ত রিটার্ন না পেয়ে তার জীবনে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় কিছু সময়ের বর্ননা করে হঠাৎ করে হারিয়ে যায় তখন।অনেক চেষ্টা করেও যখন দিশা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিলো না অরণ্যের, ঠিক তখনই রায়ার সহযোগীতায় অরণ্যে উদ্ধার করা সিমের তথ্যের ভিত্তিতে টাঙ্গাইল যেয়ে উপস্থিত হয় দিশার সন্ধানে।তবে লাভ তেমন কিছুই হয়নি এতে করে আরো ঈদে বাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হয় রায়া এবং অরণ্যকে। অরণ্য এবং রায়ার প্রথম দেখা হওয়ার সুযোগ তৈরী হয় রায়ার কলেজে এসে যখন অরণ্য উপস্থিত হয়।তবে প্রবল আগ্রহ নিয়ে রায়া একাডেমিক বিল্ডিং থেকে দৌড়ে এলেও দেখা করে না অরণ্য।তাদের প্রথম দেখা হয় উপন্যাসের প্রায় মধ্যবর্তী সময়ে।লেখকের বর্ননায় প্রথম দেখার রোমাঞ্চকর বিষয়,জড়তা সবই ফুটে উঠে অসাধারণ গল্পশৈলীতে।দেখা হওয়ার দিনে রায়ার সাথে উপস্থিত থাকে রায়ার পরম বন্ধু মিরা।পুরো ঘটনাটিতে যার চরিত্রে চাঞ্চল্যতার সাথে বাংলা মুভি নিয়ে এক নিদারুণ সরলতা প্রকাশ পায়। ঘটনার স্বাভাবিক প্রবাহমানতায় আরেকটু রঙ যুক্ত করে হঠাৎ করে রাফির দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ার বিষয়টা।প্রথম দিনের রুমডেটের ঝামেলা থাকে উদ্ধার করে রীতিমত নায়ক সেজে বসা অরণ্যের ছাত্রনেতা বড় ভাইয়ের সুযোগ গ্রহনে প্রেগন্যান্ট হয়ে যায় শায়লা।সেই মুহূর্তে ভালোবাসার মানুষের হাত ধরা কিংবা ছাড়ার দোটানায় পড়ে রাফি।এ সময় অরণ্যের শরণাপন্ন হয় রাফি।ঘটনার এ পর্যায়ে অরণ্য চরিত্রের মাধ্যমে ভুল করে বসা প্রিয় মানুষের হাত না ছাড়ার যে স্বর্গীয় দায়িত্বের কথা লেখক তুলে ধরা তা আসলেই অসাধারণ সাথে সাথে অনুপ্রেরণাদায়কও। এখানকার যে লাইনটি পাঠকের মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য তা হলো,"ভুল শুধরে পাশে থাকার মানুষ কোথায়?প্রেমিকা না হোক মানুষ হিসাবে তুই শায়লার পাশে থাক"। লেখক গ্রামীণ জীবন সংগ্রাম এবং সস্তা জীবন যাপনের সাথে সাথে পারিবারিক মমতাবোধের অতিসূক্ষ্ণ এবং হৃদয়স্পর্শী বর্ননা দেন তার পরিবারের অবস্থা ফুটিয়ে তোলার মধ্যমে।অল্পতেই কেঁদে ফেলা সারল্যতায় টইটম্বুর গ্রামীন প্রতিকী মা,সহজ সাধারণ বোন আর শর্তহীন স্বার্থহীন প্রবাসে জীবন অতিবাহিত করা সংগ্রামী বাবা যায়গা পেয়েছে অত্যান্ত আবেগী স্পর্শে।ঈদের দিনেও বাবার আত্নত্যাগ,মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে দুঃখ লুকানোর গ্রামীণ সংস্কৃতি,বোনের সহজ স্বাভাবিক আনন্দ আর মায়ের ছেলের প্রতি সেই শৈশবীয় মনোভাবের অপরিবর্তন সাথে স্বামীর উপহারের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা পাঠক হৃদয়কে আন্দোলিত করতে বাধ্য। পুরো লেখাটিতে বিষ্ময়তার একটা বড় অংশ দখল করে রেখেছে অরণ্যের মামা সুফিয়ানের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি।ঢাবিতে পড়ার সুবাদে দীর্ঘদিন মামার অস্তিত্ব অনুসন্ধানে দিনের পর দিন কাটিয়ে যখন লাভ হচ্ছিলো না তারই মধ্যে বিপদের সময়ে নোংরা মানষিকতার পরিচয়বহনকারী কিছু মানুষের অসাধু উদ্দেশ্য হাসিলের যে বহিঃপ্রকাশ লেখক লেখনীর মাধ্যমে ঘটিয়েছে তার পুরোটাই প্রকৃতপক্ষে সামজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি।মামা সুফিয়ানের বাসা ছাড়ার প্রধান কারন হিসাবে ধরা যায় গ্রামের মেয়ে শিউলির সাথে তার প্রেমবিভ্রাট।লেখকের সাথে যখন গ্রামে শিউলি খালার সাথে দেখা হয় তখন শিউলি তার স্বামী হারিয়ে সন্তানের জননী।এ পর্যায়ে সুফিয়ানের জন্য মাফলার আর সোয়েটার বোনায় প্রকাশ পায় হারিয়ে ফেলা ভালোবাসার প্রতি গভীর মমতাবোধ আর স্মৃতিকাতরতা। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানোর আগে আগে সল্প বেতনের একটি চাকরিতে যুক্ত থাকে অরণ্য।কিন্তু বসের চরিত্র তেমন একটা পছন্দনীয় হয় না অরণ্যের নিকট সাথে তার ব্যবহার যথেষ্ট কুরুচিপূর্ণ। যার কারনে এক পর্যায়ে সে চাকরি ছাড়তে মনস্থির করে এবং সফলও হয়।এরই কিছু দিনের মধ্যে পত্রিকায় প্রকাশ পায় তার ছেড়ে আসা অফিসের বস সহ কিছু কলিগের গ্রেপ্তার হওয়ার সংবাদ। কারন হিসাবে লেখা থাকে ড্রাগ স্মাগলিং এ সম্পৃক্ততা। রায়া এবং অরণ্যের সম্পর্ক দিনে দিনে গভীরতা লাভ করে। কিন্তু তবুও তাদের মধ্যে থেকে যায় অদ্ভুত এক জড়তার দেওয়াল।হুট করে একদিন রায়ার মেডিকেলের বান্ধুবির সাহায্যে খোঁজ মেলে সুফিয়ানের তবে মৃত অবস্থায়।এইখানে লেখক মমতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছে হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলো।মামার লাশ খুলনায় নিয়ে আসার পথে দিশা নামের মেয়েটির ফোন পেয়ে আতকে উঠে অরণ্য তবে উত্তেজনা সংবরণ করতে সক্ষম হয়।তবে ঘটনার বিবর্তনে জানা যায় দিশা এতোদিন পর উদয় হয় তার বর্ননা করা মিথ্যে গল্পের সত্যতা প্রকাশে।আর এই নিষ্ঠুর কাজটি সে করে প্রতিশোধ হিসাবে। উপন্যাসটির প্রেম বিচ্ছেদ পারিবারিক সংগ্রামের পাশাপাশি খন্ড খন্ড ভাবে প্রকাশ পেয়েছে মিলি আপু কিংবা মাজেদা খালার মত রক্তের বন্ধনহীন মানুষের প্রতি গভীর স্নেহ মায়া।সাথে প্রবল কষ্টের সানিধ্যে থেকেও প্রিয় মানুষকে সাথে নিয়ে বাকি পথ পাড়ি দেওয়ার সাহসী মনোভাব ফুটে ওঠে মাজেদা খালা আর মিলি আপু চরিত্রে। উপন্যাসের শেষ দিকে লেখক কিছু টুইস্ট এনে দিয়েছেন।যা উপন্যাসটিকে নিয়ে পড়ার পরেও ভাবতে জোর করবে।ঠিক যখন মনে হচ্ছিলো রায়া এবং অরণ্যের মধ্যে পরিনয় কেবল সময়ের দাবি ঠিক তখনই সব অনুমানে জল ঢেলে দেয় রায়া চরিত্রটি।অরণ্যের আবেগী অনুরোধ রায়া ফিরিয়ে দেয় অত্যান্ত চতুরতার সাথে।এই অংশটুকুতে রায়াকে ভীষণ হিসাবি করে ফুটিয়ে তোলেন লেখক।গল্পের শেষটায় এসে পাঠক সমাজ চাইলেই রায়াকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে কিংবা অরণ্যের প্রতি সহানুভূতিও দেখাতে পারে। পুরো উপন্যাসটিকে লেখকের বর্ননা পাঠককে গ্রামের কাছাকাছি নিয়ে যাবে।কাল্পনিক চরিত্রগুলোর বাস্তব রুপায়ন ঘটিয়েছেন লেখক।লেখকের শব্দ চয়নগুলো সোজাসুজি পাঠকের ভিতরে যায়গা করে নেবে।কল্পনার জগতের বিশালতার বড় যায়গা জুড়ে স্থান পেয়েছে চন্দন গন্ধের বন।যায় প্রকৃত কোনো অস্তিত্ব উপন্যাসে না থাকলেও তিনি তার এই কল্পনার অংশটুকু রায়ার মধ্যেও সঞ্চালন করতে সক্ষম হয়েছেন। পাঠক হৃদয়কে দারুন ভাবে আকর্ষন করবে এমন কিছু লাইন হলো, "আল্লায় খালি পাও দুইটা রাখে নাই।কিন্তু মনটা দিছে বিরাট বড়।" সবুজাভ শান্ত দিঘির জলে পানকৌড়ির মতো পরিচয়ের দিন। "এ শহর বোঝে না গ্রামীণ অভিমান" "তুমি শহরের ওই প্রান্তে থাকো,থাকে অনেকেই।তবু তোমার দীর্ঘশ্বাস আমি টের পাই"। " তোমাকে আমার পড়তে ভালো লাগে,মনে হয়,পৃথিবীর তাবৎ সেরা বই পড়ে ফেল তুমি"। এছাড়াও এমনই অসংখ্য হৃদয়স্পর্শী চরনে উপন্যাসটির ঘটনা প্রবাহ ঘটে। লেখক আবদুল্লাহ আল ইমরানের লেখনীতে একই সাথে প্রকাশ পেয়েছে গ্রামীন জনপদের সহজ স্বাভাবিকতা সাথে শহর থেকে দূরে বেড়ে খুলনা শহরের নৈসর্গিক অপার সৌন্দর্যের চমকপ্রদ বর্ননা এবং শহরীয় কোলাহল আর ব্যস্ত সময়ের উত্তেজনাপূর্ন বর্ননা। বইটিতে আমার খুব পছন্দের যে জিনিসটি ছিলো তা হলো কবিতাটি।তার কিছু চরণ দিয়ে শেষ করছি, আপত্তি নেই ভীষণ রোদেও কিংবা মেঘের আনা গোনায় নদীর বুকে জলের ছায়ায়,ভাসল না হয় ভিন্ন মায়ায়! আমার শুধু মাথার ওপর বিশালতার প্রতীক হয়ে নিজস্ব এক আকাশ লাগে। শীত-বর্ষা হেমন্ততেও দিন কি গভীর মধ্যরাতে যখন-যেমন ইচ্ছে জাগে খুব নীরবে নদীর ধারে চুপটি করে দেখার মতো নিজস্ব এক আকাশ লাগে, আকাশ লাগে।

Review Upload 1
Review Upload 2

প্রশ্ন ও উত্তর (Q/A)

দুঃখিত, কোনো প্রশ্ন উত্তর পাওয়া যায়নি।

সাদৃশ্যপূর্ণ পণ্যসমূহ (Similar Products)