

Buy আয়শা Online in Bangladesh
লেখক: ফৌজিয়া খান তামান্না
- Author: ফৌজিয়া খান তামান্না
- Publisher: চলন্তিকা
- Isbn: 9789849757788
- Number Of Pages: 121
- Language: বাংলা
- Edition: 1st Edition, 2023
পণ্য সারসংক্ষেপ (Summary)
"খুব ছোটো একটা পরিবারে বেড়ে ওঠা আমার। বাবা-মা, ভাইয়া আর দাদা। দাদী ও ফুফিরা প্রায়ই বাসায় আসতো। কিন্তু আমার সাথে তাদের আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। যৌথ পরিবারে যেমন সুদৃঢ় বন্ধন থাকে আমি এর সাথে ছিলাম সম্পূর্ণ অপরিচিত। স্কুল-কলেজেও কয়েকজন বান্ধবী ছিল মাত্র। ব্যস, এতটুকুই ছিল আমার জগৎ। সেই আমিই বউ হয়ে আসি বিশাল এক পরিবারে। যেন ছোট্ট একটা ডোবা থেকে পুকুরে নয় সোজা সমুদ্রে এসে পড়লাম। আমার স্বামীরা ছয় ভাই, পাঁচ বোন। আমার স্বামী সবার ছোটো। তাই বিয়ে হওয়ার সাথে সাথেই চাচী, মামী হওয়ার পাশাপাশি নানী-দাদীও হয়ে গিয়েছিলাম। সবাই একসাথে হলে বাচ্চাদের সংখ্যাই ত্রিশ ছাড়িয়ে যায়। আমার বড়ো সমস্যা ছিল সবার পরিচয় মনে রাখা। কিন্তু তাদের বন্ধন এতোই অটুট অল্পদিনেই আমি সবার সাথে পরিচিত হয়ে গেলাম। প্রথমেই আমার বাচ্চাদের সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কেন যেন বাচ্চাদের সাথে আমি বাচ্চার মতোই মিশতে পারি। কিন্তু বড়োদের বেলায় একটু বিপাকে পড়লাম। একেকজন একেকরকম, একেক জনের চিন্তাধারা একেক রকম। একটা কাজে একজন খুশি হলে অন্যজন বেজার হন, কেউ নরমাল একটা কথা বললে আমি বিরাট মনে কষ্ট পেয়ে বসে থাকি, আবার কেউ একটু রাগ দেখালেও সেটা স্বাভাবিক আচরণ ধরে বসে থাকি। এসব ক্ষেত্রে আমার স্বামী আমাকে হাতে-কলমে আমার দায়িত্বগুলো বুঝিয়ে দিয়েছে, কোন ক্ষেত্রে কোনটা ন্যায়সঙ্গত আচরণ হবে শিখিয়েছে। আমি ধীরে ধীরে ঠিকই শিখে নিচ্ছিলাম সব। কিন্তু শুধুই দায়িত্ব মনে করে করছিলাম, তৃপ্তিটা পাচ্ছিলাম না। এসবের মাঝেই নিজে কীভাবে সুখী হবো একদিন হঠাৎ করেই যেন সেই গুপ্তবিদ্যাটার সন্ধান পেয়ে গেলাম। ‘আয়শা’ এই উপন্যাসিকাটা পড়তে পড়তে নিজের ভেতর থেকেই যেন আমার আমিটা বলে উঠেছিল, ‘এতোদিন শুধু জানতাম আমি কী চাই, কিন্তু কীভাবে পাব তা এখন জেনেছি।’ আমি সুখী হবো নাকি হবো না তার চাবিকাঠি আমার নিজের হাতেই থাকবে, অন্য কারো হাতে দেব না, এটাও শিখলাম ‘আয়শা’র কাছ থেকে। এটাও জানলাম ‘আমি একাই সুখী হবো’ এ চিন্তাটা দিয়ে হয়তো একা একাই সুখী হওয়া যায়। কিন্তু একা একা সুখী হওয়ার চাইতেও সবাইকে নিয়ে সুখী হওয়াটা আরো বেশি সুখকর। ‘আয়শা’ অসাধারণ কেউ না। এতোই সাধারণ যে কারো চোখে পড়বে না। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বটাই এমন, তার সান্নিধ্যে যে আসবে সে বিস্মিত হবেই। উপন্যাসিকাটা পড়তে পড়তে আমি বারবার নিজেকে আয়শার সাথে মেলাতে চাচ্ছিলাম, ওর জায়গায় আমি হলে কী করতাম, আর ও কী করছে! তারপর আয়শার প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এসেছে। আমার স্বীকার করতে একটুও বাঁধছে না, উপন্যাসিকাটা পড়ে আমি নিজের মনে বলেছি, ‘আমি আয়শা হবো।’ আয়শা দেখতে সাধারণ গোছের, কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্বে, স্ত্রী হিসেবে, শ্বশুরবাড়িতে বউ হিসেবে, মা হিসেবে সে অনন্য।
রিভিউ ও রেটিং (Review & Rating)
"আয়শা" বইটা নিয়ে কিছু বলার আগে, কিভাবে ফৌজিয়া খান তামান্না আপুর লেখার সাথে পরিচয় হল তা নিয়েই কিছু স্মৃতিচারণ করি। তামান্না আপুর সাথে পরিচয় হবার আগে "দহনচিহ্ন" নামে এক উপন্যাসের সাথে আমার পরিচয়। "প্রমোশন পোস্ট থেকে কয়েক পর্ব পড়েই আমি জুরিন আর ফুল ম্যাম কে মনের গহীনে জায়গা দিয়েছিলাম"।জুরিন আর ফুল ম্যাম ধরতে গেলে আমার ইমোশন এবং গোপন ভালোবাসা। কেন আমার ভালোবাসা এবং ইমোশনের বইটা না পড়ে আগে "আয়শা " পড়েছি নিজেও জানি না। "আয়শা" বইটা সাধারণত প্রেমের বই ধরা যাবে না।এই বইয়ে কিশোরী বয়সের প্রেম নিবেদন করার পর রিজেক্ট হবার মতো একটা ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নেই। তাহলে এই বইয়ে কী আছে? "আয়শা" বইটায় আছে সাধারণ এক মেয়ে থেকে অসাধারণ এক নারী হয়ে ওঠার গল্প।যে নারী যে কোন প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সন্তানের জন্য যে নারী সেরা মা হয়ে ওঠতে পারে । এবং ঐ নারীটাই ঘরে বাইরে পুরো দমে সামাল দিতে পারে। সর্বোপরি যে নিজেকে ভালোবাসতে জানে এবং তার আশেপাশে সবাইকে ভালো রাখতে জানে। "আয়শা" পড়লে যে কারো মনে হবে আমি তো এতো কিছু পারব না !"আয়শা" কিভাবে পারল? লেখক কী ইচ্ছে করেই আয়েশাকে এমন অসাধারণ করেছেন? হ্যা, লেখক ইতিবাচক দিকটাই দেখিয়েছেন। হয়তো আমরা যারা অনেক কিছুই পারি না তারা "আয়শা" পড়লে একটু হলেও মনোবল পাবো , আমাদের মনে সাহস জুগাতেই আয়শা চরিত্রের জম্ম। "আয়শা নামের মেয়েটা এখানে প্রধান চরিত্র হলেও আমার কাছে উপল , আরিয়ান কে গল্পের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু থেকে কোন অংশে কম মনে হয় নি"। ছোট্ট আরিয়ানই বইটা কে আরো প্রাণবন্ত করেছে। একমাত্র ওর জন্যই আমি চোখের জল ফেলেছি। "উপল" ভালো ছেলে।যে লেখাপড়ায় ভালো , যার ভালো ডিগ্রি আছে। কিন্তু ভালো ছেলেদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করলেই যে ভালো হওয়া যায় না উপল যেন তার জ্যান্ত উদাহরণ। দিনশেষে সে কিছুই হতে পারি নি।না পরিবারের কাছে ভালো হয়েছে না সে অন্য কারো কাছে ভালো হতে পেরেছে।উপল সব সময় নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বেরিয়েছে।আর যারা দায়িত্ব থেকে পালাতে চায় তারা দিনশেষে সুখী হতে পারে না। উপলের জীবনের কোন লক্ষ্য ছিল না। দিনশেষে সে যে কিসে খুশি নিজেই বুঝতে পারিনি। উপলের জন্য যেমন আমার রাগ হয় তেমন আফসোসও হয়।ইশ্ বেচারা নিজে না সুখী হতে পারল,না অন্যকে সুখী করতে পারল ! "ঊর্মি " আমার পছন্দের একটা চরিত্র।যে সম্পর্কের ব্যালেন্স করাটা খুব ভালো বুঝে। বন্ধু হিসেবে ভালো ছিল , সন্তান হিসেবেও সাপোর্টিভ ছিল বাবা মার প্রতি। আমার কাছে বইটা ভীষণ ভালো লেগেছে ।বইয়ের কিছু কিছু সংলাপ এতোটাই ভালো লেগেছে যে এখনো আমার মনে গেঁথে আছে। সর্বোপরি আমার কাছে মনে হয়েছে বইটা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। বইটা পরপর দুইবার পড়ে শেষ করেছি। যদি বলা হয় বইটার পজেটিভ সব বললেন, নেগেটিভ কী কিছু নেই?তাহলে বলব কিছু জায়গায় বানান ভুল, কিছু জায়গায় শব্দ জোড়া লাগানো ছাড়া বেশি কিছু চোখে পড়েনি আমার। প্রচ্ছদ আমার কাছে যুতসই লেগেছে। সবশেষে বলতে বলব বইটা কাউকে গিফট করতে চাইলে বা কিশোরী বয়সের কারো জন্য নিতে চাইলে নির্দ্বিধায় নিতে পারবেন। বই : আয়শা লেখক: ফৌজিয়া খান তামান্না প্রচ্ছদ: ফাইজা ইসলাম প্রকাশনী: চলন্তিকা মলাট মূল্য: তিনশ টাকা

#রিভিউ ❝তুমি আয়শা তোমায় দুর্বল ভাবলে হবে ভুল, তুমি নারী তুমি এই বিশ্বের সমতার ফুল। তুমি নারী, তুমি মা, তুমি স্ত্রী, তুমিই কন্যা, তুমি আয়শা, তুমিই অন্যন্যা।❞ ~ফ্ল্যাপ থেকে একজন নারী জীবনের অনেকগুলো ধাপ পাড়ি দিয়ে থাকে। একেকসময় একেক ভূমিকায় নারীদের দেখা যায়। শক্ত হাতে নারীরা সবকিছু ঠিক রেখে জীবন অতিবাহিত করে। জীবনে চলার পথে বহু বাঁধা, বিপত্তির মুখোমুখি হয় তারা। তবুও হার মানলে কি জীবন চলবে! এসবকিছু সামলে নিয়েই তারা এগিয়ে যায়। এমনিই এক মেয়ের নারী ও মা হওয়ার গল্প ‘আয়শা’। ★ কাহিনী সংক্ষেপ: চাকরিসূত্রে বদলির হওয়ার পর আয়শা আর উপলের পরিবার বেশ দীর্ঘ সময় ধরে পাশাপাশি বসবাস করছে। অবশেষে ঢাকার মিরপুরে এই দুই পরিবারের স্থায়ী বসবাসের শুরু হয়। উপল ছোটবেলা থেকেই বেশ মেধাবী ছাত্র ছিল। সাধারণ দেখতে আয়শা ছিল উপলের ছোটবোন উর্মির ক্লাসমেট। কৈশোরকালে আয়শার মনের মধ্যে উপলের জন্য ভিন্নরকমের অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু, উপলের জন্য এই বিষয়টি বেশ পীড়াদায়ক ছিল। কেন? কী হয়েছিল ভবিষ্যতে? এই দুই পরিবারের মধ্যকার বন্ধন ও আয়শা, উপল এর পরিণতি জানতে হলে পড়তে হবে সমকালীন উপন্যাস ‘আয়শা’। ★ পাঠ প্রতিক্রিয়া: ‘আয়শা’ উপন্যাসটি মূলত উপলের ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। প্রথমেই দুই পরিবারের চমৎকার বন্ধনের মাধ্যমে উপন্যাসের সূচনা হয়। উপজেলায় পাশাপাশি কোয়ার্টারে আয়শা ও উপলের পরিবারের বসবাস। খুব অল্পদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যকার বন্ধনটা দৃঢ় হয়ে উঠে। খুবই সাধারণ দেখতে আয়শা মন দিয়ে বসে উপলকে। উপলের এই বিষয়টা নিজের মনের অশান্তির কারণ হয়ে উঠে। এরপর কেটে যায় অনেক সময়। সবার জীবনের মোড়ও বদলে যায়। উপন্যাসে বেশকিছু নতুন নতুন চরিত্রের আগমন ঘটে। হৃদিতা, নোমান সহ আরোকিছু চরিত্রের দেখা মেলে। উপলের ভাষায়, আয়শা কারো নজরে পড়ার মতো না। আসলেই কি তাই? আয়শা আমার খুব পছন্দের একটি চরিত্র। নারীদের আয়শার মতোই হওয়া উচিত। এমন মনোবলের অধিকারী হলে সকল কিছু মোকাবেলা করা সম্ভব। উপলের ভুলটাও ধীরে ধীরে ভাঙতে থাকে কিন্তু সময়টা বড্ড ভুল ছিল! নোমান চরিত্রটিকেও দারুণ লেগেছে। এমন পুরুষ স্বামী হিসেবে পেলে নারীরা শান্তিমত সংসার করতে পারে। স্ত্রীর আপদে বিপদে সবসময় পাশে থাকে নোমান। এছাড়া, বন্ধুদের বিপদেও তাকে সবসময় পাওয়া যায়। বাস্তবে এমন পরোপকারী মানুষ পাওয়া বেশ কঠিন। নাকউঁচু স্বভাবের হৃদিতার মতো চরিত্র বাস্তবেও দেখা যায়। বড়লোকের আহ্লাদী স্বার্থপর মেয়ে হৃদি। সংকীর্ণ মনের অধিকারী এই চরিত্রটি নিজেকে ছাড়া কিছুই বোঝে না ও সবসময় অন্যের মনোযোগ পেতে চায়। সমাজের মনমতো পারফেক্ট হতে চেয়েছে উপল। কিন্তু এটা কী আদৌও সম্ভব! কিছু অপূর্ণতা সবসময় থেকে যায়। আর এইসব অপূর্ণতা নিয়েই তো জীবন। সমাজের দৃষ্টিতে উপলকে পারফেক্ট লাগলেও তার জীবনের বাকি অংশটা কী পারফেক্ট করতে পেরেছিল সে? সমাজে কিছু স্বার্থপর মানুষ আছে যারা নিজের দিকটাই সবকিছুর আগে দেখে। অন্যের সুবিধা বা অসুবিধার কোন খেয়াল তারা রাখে না। যার ফলে অনেক সময় বড় বিপদ বা দুর্ঘটনাও ঘটে যায়। ‘আয়শা’ উপন্যাসেও এমন একটি ঘটনার দেখা মেলে, যা অনেকগুলো মানুষের জীবন বদলে দেয়। উপন্যাসের সমাপ্তিটাও বাস্তবসম্মত লেগেছে। কোন অতিরঞ্জিত বিষয় লেখক শেষটাতে দেননি। একারণে শেষটা চমৎকার হয়েছে। ★ বইটির কোয়ালিটি, বাঁধাই সবকিছু ভালো ছিল। দামটাও আমার কাছে ঠিক লেগেছে। সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে বইয়ের প্রচ্ছদটা। প্রচ্ছদে আয়শার ছবিটাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া নয়নতারা ফুলের কারণে প্রচ্ছদটা অসাধারণ হয়ে উঠেছে। ★ ‘আয়শা’ উপন্যাসটি একবসায় পড়ে ফেলবার মতো। রাত ১২.৩০ টায় উপন্যাসটা পড়া শুরু করে শেষ করেছি ভোর ৫.৩০ টায়। আমাদের সমাজের বেশিকিছু দিক ও অসংগতি লেখক তুলে ধরেছেন। ‘আয়শা’ উপন্যাসের চরিত্রগুলোও আমাদের আশেপাশে অহরহ দেখা যায়। উপন্যাসটি পড়ার সময় কখনো তৃপ্তিতে মনটা ভরে উঠবে আবার কখনো চোখে জল চলে আসবে। সবমিলিয়ে দারুণ লেখনীর ‘আয়শা’ বইটা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে এবং বইয়ের সাথে চমৎকার কিছু সময় কেটেছে। ★ বই পরিচিতি: বই: আয়শা লেখক: ফৌজিয়া খান তামান্না প্রকাশনী: চলন্তিকা প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৩ প্রচ্ছদ: ফাইজা ইসলাম ক্যাটাগরি: সমকালীন উপন্যাস মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১২০
“আয়শা” বইটায় আমার আগ্রহের মূল কারণ ছিল এর নামটা। আমার নানুর নাম ছিল আয়শা। নানুকে আমি অতবেশি না পেলেও মহাব্যস্ত লেখক-সাংবাদিক স্বামী, প্রতিদিনের অগুনতি অতিথি, নিজেদের নয়টা ছেলেমেয়ে, একপাল নাতিনাতনি আর একদল পোষ্য কী সহজে সামলাতেন, সেটা মনে পড়ে। কোনোদিন গলা উঁচু করে এমনকি আমাদেরকেও বকুনি দিতে শুনিনি। নানা’র সাথে কথা কাটাকাটির তো প্রশ্নই আসে না—অন্ততঃ আমাদের চোখে কখনো পড়েনি। সবসময় মুখে হালকা একটা হাসি লেগে থাকা “আয়শা” নামের এই মানুষটি হয়ত তাঁর নামের অর্থের মতোই সুখী ছিলেন। বইয়ের আয়শা অনেকটা সেরকমই। নিজে সুখী থেকে আশেপাশের সবাইকে সুখী রাখার চেষ্টা করে সারাজীবন। সেটা সে পারেও। কৈশোরের প্রেম তার কাছে ধরা না দিলেও সেটা নিয়ে সে ভেঙে পড়ে না একটুও। সেই ভালোলাগা কৈশোরেই ফেলে এসে আয়শা বিয়ে করে যেই পুরুষটি তার মধ্যে নিজের সারা পৃথিবী খুঁজে পায়, তাকেই। সারাজীবন সুখে থাকা তো প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ, তাই আয়শার জীবনেও নামে ঝড়। সেই ঝড়টাই এই উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্স। সে ঝড়ের আঘাতে শুধু আয়শার পরিচিতজনরাই নয়, আমরা পাঠকরাও প্রবল বেদনায় আপ্লুত হই। কিন্তু আয়শা থাকে ঋজু। সে ঋজুতা কতটা স্বাভাবিক, আমি জানি না। যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আয়শা গেছে, সেখানে পুরোটা সময় নিজের কোনো অনুভূতি প্রকাশ না করাটা কি আসলে তাকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখে? কার কাছে, কেন এই কঠিন রূপ? বাইরে না দেখালেও আয়শার অন্তরের বেদনাটুকু যদি পাঠকের কাছে উন্মুক্ত হতো, হয়ত আয়শাকে আরও কাছের, আরও পরিচিত মনে হতো। ওই কাঠিন্য, ওই ঋজুতা যেন আয়শাকে সাধারণের চেয়ে বহুদূরে নিয়ে গেছে। গল্পের ভূমিকা থেকে মনে হচ্ছিল যে এই মেয়েটিকে হয়ত চিনেছি, কিন্তু শেষে গিয়ে সে হয়ে উঠল অচেনা। হৃদয়ের মধ্যে জায়গা নেওয়ার চেয়ে সে কেমন এক সুপারওম্যান হয়ে উঠল—সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আয়শাকে কি আরেকটু সাধারণ, আরেকটু স্বাভাবিক করা যেত না? শেষের দিকে আয়শার কথা, ওর আচরণ পড়তে পড়তে কেমন একটা হাঁপ ধরা, দম আটকানো অবস্থা হয় ভেতরে। উপল বা হৃদিতার আচরণ তাই শেষে এসে খুব অস্বাভাবিক লাগে না। পুরো গল্পটা বলা হয়েছে উপলের ভাষ্যে যে কিনা ছোটোবেলা থেকেই আয়শাদের প্রতিবেশী। পুরোটাই আমরা দেখি উপলের চোখ দিয়ে। তবে এই কাহিনীতে আয়শা যতটুকু আছে, উপল তার চেয়ে কম নয়, বরং বেশিই আছে। আয়শা আর উপলের পাশাপাশি এখানে আছে হৃদিতা, উর্মি, আর নোমান। আরও আছে নাওমি আর আরিয়ান। সবাইকে নিয়ে, সবকিছু নিয়ে “আয়শা”কে একটানে পড়ে যাওয়ার মতো একটি সামাজিক উপন্যাস বলতে বাধা নেই। আর তার একটা বড়ো কারণ শুধু মূল চরিত্রগুলোর বিস্তার নয়; তাদের পাশাপাশি অন্য চরিত্রগুলোর প্রকাশও একদম পরিমিত। ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকুই। তবে এই কাহিনীর কোনোকিছুই বিস্তারিত বলার উপায় নেই, তাহলেই স্পয়লার দিয়ে রসভঙ্গ হবে। ফৌজিয়া খান তামান্নার বই আমি আগেও পড়েছি। বলতেই হবে যে আগের পড়া দু’টো বইয়ের তুলনায় এই বইটি বেশ খানিকটা এগিয়ে যাবে এর সাবলীল গতি, অনায়াস গল্প বলার স্টাইল আর সহজ ভাষার দিক থেকে। আর আগের বইয়ে যেটা লক্ষ্য করেছিলাম—প্রত্যেক অধ্যায়ের শুরুর এক-দুই পৃষ্ঠা জুড়ে দার্শনিক ভাবনার প্রকাশ, সেটা এই বইয়ে লক্ষ্যনীয়ভাবে কম। এই কথাগুলো প্রয়োজনীয়, ভালো, কিন্তু উপন্যাসের প্রতি অধ্যায়ের শুরুতেই যদি কয়েক পাতা করে এরকম স্বগতোক্তি থাকে, তাতে পড়ার গতি, কাহিনীর কোহেরেন্স আর প্লটের সাবলীলতা ব্যহত হয়। “আয়শা”তে যে কারণেই এই বদলটা ঘটুক না কেন, এ কারণেই হয়ত অন্ততঃ আমার কাছে এ পর্যন্ত এটাই লেখকের সেরা বই। বইয়ের প্রচ্ছদ আহামরি না হলেও চোখ টানে। হয়ত বেগুনি রঙ আমার একটা পছন্দের রঙ বলে। অল্প কিছু বানান ভুল আছে, আছে কিছু শব্দ একসাথে জোড়া লেগে যাওয়ার সমস্যা। কিন্তু সেগুলো তেমন অসুবিধা করে না। পরের সংস্করনে শুধরে দিলেই হবে। চলন্তিকার বাঁধাই এ পর্যন্ত আমি একই রকম মানসম্মত পেয়েছি, তাই সেখানেও কিছু বলার নেই। নামটা কি আরেকটু ভাবা যেত? আগেও বলেছি, আবারও বলছি—এখানে আয়শার পাশাপাশি উপলের কাহিনীও কিন্তু সমান্তরাল লাইনে চলেছে—বরং বেশিই আছে। তাই শুধু “আয়শা” বললে সেই চরিত্রটিকে নিয়ে আরও বেশি কাজ করার স্কোপ না রাখাই ভালো—অন্ততঃ পাঠকের মনে। আর কথা থাকে শেষটায়। ঠিক যতটা শক্ত গাঁথুনির হলে শেষটা পড়ে মনে হতো যে, হ্যাঁ, এর জন্য এর চেয়ে ভালো সমাপ্তি হয় না, “আয়শা”র শেষটা তেমন মজবুত মনে হয়নি। তবে সবমিলিয়ে যে কোনো বয়সী পাঠকের জন্য সুখপাঠ্য একটি উপন্যাস “আয়শা”— সে কথা জোর গলাতেই বলব॥ বই: আয়শা লেখক: ফৌজিয়া খান তামান্না জনরা: সামাজিক পৃষ্ঠা: ১২০ দাম: ৩০০.০০ টাকা প্রচ্ছদ: ফাইজা ইসলাম প্রকাশনী: চলন্তিকা প্রকাশকাল: ২০২৩ ব্যক্তিগত রেটিং: ৭.৫/১০
▪️বইঃ আয়শা ▪️লেখকঃ ফৌজিয়া খান তামান্না ▪️প্রচ্ছদঃ Fiza Islam ▪️প্রকাশনীঃ চলন্তিকা ▪️মলাট মূল্যঃ ৩০০ টাকা ▪️জনরাঃ সমকালীন ◾ভূমিকাঃ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, লেখক ও সম্পাদক ফৌজিয়া খান তামান্নার পঞ্চম একক বই "আয়শা"। আমাদের আশেপাশে এমন আয়শা অনেক আছে। আয়শা শুধু একটি উপন্যাস নয়, একজন নারীর পূর্নাঙ্গ জীবনের গল্প। বইটি পড়তে গিয়ে বিভিন্ন অনূভুতি হয়েছে। এই চমৎকার উপন্যাসটি শেষ করেও যেনো এর ঘোর থেকে বের হতে পারছিনা। ◾নামকরণঃ জীবনে যত কঠিন সময়ই আসুক না কেনো, আয়শার মতো হতে হবে। উপন্যাসের সাথে এই নামকরণটি আমার কাছে যথাযথ লেগেছে। ◾প্রচ্ছদঃ চমৎকার নজরকাড়া এই প্রচ্ছদটির কথা না বললেই নয়। জনপ্রিয় প্রচ্ছদ শিল্পী ফাইজা ইসলাম রং তুলিতে ঠিক যেন আত্নবিশ্বাসী ও দৃঢ়তার প্রতীক এক নারী রূপে আয়শাকেই তুলে ধরেছেন প্রচ্ছদে। চমৎকার প্রচ্ছদটি আমার কাছে দারুণ লেগেছে। ◾কাহিনী সংক্ষেপেঃ কাহিনি শুরু আয়শা আর উপলকে ঘিরে। পুরো উপন্যাসটিতে উপলের ভাষায় বর্নিত হলেও এর কেন্দ্রবিন্দু ছিলো আয়শা নামের অতি সাধারণ মেয়েটি। ছোটবেলা থেকে পাশাপাশি বসবাস করা উপল আর আয়শার পরিবার যেন একে অপরের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠে। সেই সুবাদে আয়শা আর উপলের মধ্যেও একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে কিন্তু সেটা কী ভালোবাসা? না অন্তত উপলের তরফ থেকে তো একদমই না। উপলের মতো ব্রিলিয়ান্ট, সুদর্শন একজন ছেলের কাছে আয়শা অতি সাধারণ একজন মেয়ে, যে উপলের যোগ্যই না। আয়শাকে নিজের কাছের বন্ধু নোমানের ঘাড়ে গোছাতে পেরে, যেই উপল একসময় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলো, সেই ই কিনা একসময় তাদের দুজনকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিন্তু কেন? এই সবকিছুর উত্তর মিলবে "আয়শা" উপন্যাসটি পড়লে। ◾পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ আমরা সৌন্দর্যের পিছে ছুটতে গিয়ে খাঁটি সোনা হারিয়ে ফেলি। খাঁটি সোনা চিনতে যে ব্যর্থ তার জীবনে সুখ আসাটা আপেক্ষিক। জীবন আমাদের অনেক পরিস্থিতির সম্মুখীন করে। অনেক সময় ফেলে আসা সময় গুলোর জন্য আমরা আফসোস করি। যাদেরকে একটা সময় তুচ্ছ ভেবে দূরে রেখেছি তাদের কথা মনে পড়ে। জীবন বয়ে চলা নদীর মতো, কখন স্রোতে ভেসে যাবো কেউ জানিনা। তবে যাদের দেখে অনেক সুখী মনে হয় তারা আদৌও সুখী কিনা? সেই মানুষ গুলোর মনের গহীনে কী কোনো গোপন ব্যথা লুকিয়ে নেই? যাদের আমরা সুখি ভেবে মনে মনে আক্ষেপ করি তাদের জীবনেও হয়তো লুকিয়ে থাকে অনেক কষ্ট, অভিমান, নানাবিধ ঝামেলা। এসব মোকাবেলা করেই কীভাবে সুখ নামের সোনার হরিণের সন্ধান পাওয়া যায়, ভালো থাকা যায় সেই কৌশলটাই লেখক তার লেখনশৈলী দিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন। এই চমৎকার উপন্যাসটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। বইটি পড়ার পুরোটা সময় আমার মুখে তৃপ্তির এক আনন্দ খেলা করেছে। আমি কখনো ব্যথিত হয়েছি, কখনও উদ্বিগ্ন হয়েছি আবার কখনও হেসেছি। এই বইটি প্রিয় বইয়ের তালিকায় জমা হলো। ◾চরিত্র বিশ্লেষণঃ আয়শা উপন্যাসের কোন চরিত্রই কাল্পনিক, অবাস্তব মনে হয়নি। আমাদের আশেপাশে এমন মানুষ অনেক আছে। সবাইকে নিয়ে লেখা তো সম্ভব নয় তবে বিশেষ কিছু চরিত্র নিয়ে না বললেই নয়। 🔸আয়শা: দেখতে উজ্জ্বল শ্যামলা, মাঝারি গড়নের অতি সাধারণ একটি মেয়ে। কোন গল্প বা উপন্যাসের নায়িকার মতো সৌন্দর্য আয়শার কখনোই ছিলো না। আত্নবিশ্বাসী, নম্র, ভদ্র, সাংসারিক ও মায়াবতী এক নারী আয়শা। এই চরিত্রটি পুরো উপন্যাস জুড়েই রাজত্ব করেছে। 🔸নোমান: সবসময় হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল একটি চরিত্র। নিজের জীবনসঙ্গীকে সন্মান ও ভালোবাসা দিতে যার এতটুকু কার্পণ্য নেই। সত্যি বলতে এমন একজন মানুষকেই মানায় আয়শার পাশে। নোমানের মতো জীবনসঙ্গী থাকলে জীবনের খাতা এমনিতেই বদলে যায়। এমন নোমান প্রতিটা ঘরে ঘরে থাকুক। 🔸উপল: এই উপন্যাসের সবচেয়ে অপছন্দের চরিত্র হলো উপল। উপল যে কি চায় উপল নিজেই জানেনা। একটা সময় আয়শাকে উপেক্ষা করেছিলো, আবার সেই আয়শার জন্যই ভাবতে থাকে । হৃদির মতো জীবনসঙ্গী চাওয়া স্বত্বেও হৃদিকে পুরোপুরিভাবে ভালোবাসাতে পারেনি। পরিবার,বন্ধু, স্ত্রী, সন্তান সকলের প্রতিই উপলের ভালোবাসাটা আমার কাছে গা ছাড়া লেগেছে । যারা সৌন্দর্যের পিছে ছুটে তারা কখনওই ভালোবাসতে পারে না, উপল তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। 🔸হৃদি: এমন চরিত্র আমার আশেপাশে অনেক আছে। যারা শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে। এই চরিত্রটিকে আমার কাছে প্রচন্ড অহংকারী লেগেছে। 🔸উর্মি: এই উপন্যাসের সব থেকে চমৎকার চরিত্র। উর্মির মতো বোন, মেয়ে, বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার। পুরো উপন্যাস জুরে এই চরিত্রটিকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। ◾অন্যান্য বিষয়ঃ ◾প্রকাশনীঃ বইটির প্রডাকশন ছিলো চমৎকার। কাগজ,বাইডিং, শব্দবিন্যাস, ব্যাককাভার, সবকিছু মিলিয়ে দারুণ লেগেছে । ১২০ পৃষ্ঠার ছোটোখাটো বইটি হাতে নিয়ে পড়তে আমার চমৎকার লেগেছে। ◾লেখককথনঃ ফৌজিয়া খান তামান্না লেখনশৈলী নিয়ে কিছু বলার নেই। কিছু বলার নেই বলতে দোষ খোঁজার মতো কোনো কিছুই খুঁজে পাইনি। লেখকের প্রতিটা বই আমার কাছে বাস্তবমুখী লাগে, অনেক কিছু শিক্ষনীয় বিষয় থাকে। লেখকের পরবর্তী বইয়ের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। ◾প্রিয় কিছু উক্তিঃ ১. সেদিনের পর থেকে আমি নিজেকে ভালোবাসতে চেষ্টা করতে লাগলাম। আর তখনই টের পেলাম, যেটি সবচেয়ে সহজ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই কী ভয়াবহ কঠিন কাজ! ২. একটি বাচ্চার ব্যাপারে আরেকটি বাচ্চার মাথাব্যথা নেই বললেই চলে। …… যত আগ্রহ বাচ্চার অভিভাবকদের। ৩. আঁধার পেরিয়ে দিনের আলো দিবে উঁকি, তুমি আয়শা তুমিই সূর্যমুখী। ৪. 'এই আকাশ আমি আগে কখনও দেখিনি। এই আকাশ অনেক বেশি স্বচ্ছ। অনেক বেশি নীল। এই আকাশ ভীষণ রকমের অন্তর্ভেদী। আমার চেনা আকাশ আমাকে যা বলত, তা যেন ছিল অনেকটাই অস্পষ্ট, নিরুদ্দেশ্য। আমি এই আকাশের কথা যেন সে তুলনায় অনেক ভালো বুঝতে পারছি।' ◾উপসাংহারঃ সবশেষে বলব, আয়শা উপন্যাসটি আমাদের সমাজের সেই সকল নারীর প্রতিচ্ছবি যারা আছে বলেই আমরা হাসতে পারি, মুক্তভাবে ভাবতে পারি। বইটা একবার শুরু করে শেষ না করা অব্দি স্বস্তি লাগে নাই। উপন্যাসটি আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। রেটিং: ৪.৫/৫
"তুমি আয়শা তোমায় দুর্বল ভাবলে হবে ভুল, তুমি নারী তুমি এই বিশ্বের সমতার ফুল। তুমি নারী,তুমি মা, তুমি স্ত্রী, তুমি ই কন্যা, তুমি আয়শা, তুমি ই অন্যন্যা।" 🔹বই পরিচিতি : নাম : আয়শা লেখক : ফৌজিয়া খান তামান্না জনরা : সমকালীন উপন্যাস প্রকাশনী : চলন্তিকা মুদ্রিত মূল্য : ৩০০৳ রিভিউয়ার : ফারজানা উর্মি 🔹ফ্ল্যাপ : "খুব ছোটো একটা পরিবারে বেড়ে ওঠা আমার। বাবা-মা, ভাইয়া আর দাদা। দাদী ও ফুফিরা প্রায়ই বাসায় আসতো। কিন্তু আমার সাথে তাদের আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। যৌথ পরিবারে যেমন সুদৃঢ় বন্ধন থাকে আমি এর সাথে ছিলাম সম্পূর্ণ অপরিচিত। স্কুল-কলেজেও কয়েকজন বান্ধবী ছিল মাত্র। ব্যস, এতটুকুই ছিল আমার জগৎ। সেই আমিই বউ হয়ে আসি বিশাল এক পরিবারে। যেন ছোট্ট একটা ডোবা থেকে পুকুরে নয় সোজা সমুদ্রে এসে পড়লাম। আমার স্বামীরা ছয় ভাই, পাঁচ বোন। আমার স্বামী সবার ছোটো। তাই বিয়ে হওয়ার সাথে সাথেই চাচী, মামী হওয়ার পাশাপাশি নানী-দাদীও হয়ে গিয়েছিলাম। সবাই একসাথে হলে বাচ্চাদের সংখ্যাই ত্রিশ ছাড়িয়ে যায়। আমার বড়ো সমস্যা ছিল সবার পরিচয় মনে রাখা। কিন্তু তাদের বন্ধন এতোই অটুট অল্পদিনেই আমি সবার সাথে পরিচিত হয়ে গেলাম। প্রথমেই আমার বাচ্চাদের সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কেন যেন বাচ্চাদের সাথে আমি বাচ্চার মতোই মিশতে পারি। কিন্তু বড়োদের বেলায় একটু বিপাকে পড়লাম। একেকজন একেকরকম, একেক জনের চিন্তাধারা একেক রকম। একটা কাজে একজন খুশি হলে অন্যজন বেজার হন, কেউ নরমাল একটা কথা বললে আমি বিরাট মনে কষ্ট পেয়ে বসে থাকি, আবার কেউ একটু রাগ দেখালেও সেটা স্বাভাবিক আচরণ ধরে বসে থাকি। এসব ক্ষেত্রে আমার স্বামী আমাকে হাতে-কলমে আমার দায়িত্বগুলো বুঝিয়ে দিয়েছে, কোন ক্ষেত্রে কোনটা ন্যায়সঙ্গত আচরণ হবে শিখিয়েছে। আমি ধীরে ধীরে ঠিকই শিখে নিচ্ছিলাম সব। কিন্তু শুধুই দায়িত্ব মনে করে করছিলাম, তৃপ্তিটা পাচ্ছিলাম না। এসবের মাঝেই নিজে কীভাবে সুখী হবো একদিন হঠাৎ করেই যেন সেই গুপ্তবিদ্যাটার সন্ধান পেয়ে গেলাম। ‘আয়শা’ এই উপন্যাসিকাটা পড়তে পড়তে নিজের ভেতর থেকেই যেন আমার আমিটা বলে উঠেছিল, ‘এতোদিন শুধু জানতাম আমি কী চাই, কিন্তু কীভাবে পাব তা এখন জেনেছি।’ আমি সুখী হবো নাকি হবো না তার চাবিকাঠি আমার নিজের হাতেই থাকবে, অন্য কারো হাতে দেব না, এটাও শিখলাম ‘আয়শা’র কাছ থেকে। এটাও জানলাম ‘আমি একাই সুখী হবো’ এ চিন্তাটা দিয়ে হয়তো একা একাই সুখী হওয়া যায়। কিন্তু একা একা সুখী হওয়ার চাইতেও সবাইকে নিয়ে সুখী হওয়াটা আরো বেশি সুখকর। ‘আয়শা’ অসাধারণ কেউ না। এতোই সাধারণ যে কারো চোখে পড়বে না। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বটাই এমন, তার সান্নিধ্যে যে আসবে সে বিস্মিত হবেই। উপন্যাসিকাটা পড়তে পড়তে আমি বারবার নিজেকে আয়শার সাথে মেলাতে চাচ্ছিলাম, ওর জায়গায় আমি হলে কী করতাম, আর ও কী করছে! তারপর আয়শার প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এসেছে। আমার স্বীকার করতে একটুও বাঁধছে না, উপন্যাসিকাটা পড়ে আমি নিজের মনে বলেছি, ‘আমি আয়শা হবো।’ আয়শা দেখতে সাধারণ গোছের, কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্বে, স্ত্রী হিসেবে, শ্বশুরবাড়িতে বউ হিসেবে, মা হিসেবে সে অনন্য। 🔹পাঠ প্রতিক্রিয়া : শেষ করলাম ফৌজিয়া খান তামান্না আপুর লেখা "আয়শা" বইটি। বইটি নিয়ে আসলে কী বলব বা আমার অনুভূতি কীভাবে শেয়ার করব বুঝতেছি না। আপুর লেখা এই প্রথম পড়লাম। চমৎকার লেখনশৈলী। আর বইয়ের প্লট দারুণ লেগেছে। বইটা পড়া শুরু করার পর থেকেই ভাবছিলাম বইয়ের নাম আয়শা কেন রাখা হয়েছে? কেমন লাগবে বইটা? চমৎকার শব্দচয়নে লেখা এই বইটি পড়তে একটুও বিরক্তবোধ করিনি। আয়শা চরিত্রটি আমার প্রিয় একটি চরিত্রের জায়গা দখল করে নিয়েছে। বইটার প্রতি শুরু থেকে একটা আগ্রহ ছিল ঊর্মি চরিত্রটির জন্য। কারণ অবশ্যই আমার নামের সাথে মিল বলে। ভাবছিলাম চরিত্রটি না আমার কোনো নেগেটিভ চরিত্র হয়ে যায়। কিন্তু ঊর্মি চরিত্রটিও অন্যরকম সুন্দর একটি চরিত্র, যাকে মানুষ ভালোবাসতে বাধ্য হবে। উপলের উপর আমার মাঝে মাঝে ভীষণ রাগ হতো। পরে তারজন্য মায়াও লেগেছে কিছুটা। বেচারা কত সহ্য করবে? কিন্তু শেষটায় কেন যেন তার উপর আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। যদিও সে কোনো অন্যায় করেনি বা ভুল করেনি। "আয়শা" বইটিতে আমার অপছন্দের চরিত্র হৃদিকেই বলতে পারি। প্রথম থেকেই তার উপর একটা বিরক্তি ঝেঁকে বসেছিল। আরিয়ানের ঘটনায় সে পাল্টালেও নাওমির সাথে তার ব্যবহার বিরক্তিকর লেগেছে। ছোট্ট আরিয়ানের জন্য আমার এত্তো খারাপ লাগছিল যে আমার কান্না পর্যন্ত চলে আসছিল। বারবার মনে হচ্ছিল আরিয়ানের সাথেই কেন এমনটা হলো? কিন্তু আয়শার মতো মা থাকতে আরিয়ানের জীবন থেমে থাকতে পারে না। এটাই প্রশান্তিকর। "আয়শা" এককথায় চমৎকার একটি বই। বইটি থেকে শেখার আছে অনেককিছুই। কিছু চরিত্রকে আমাদের আশেপাশের মানুষদের সাথেও রিলেট করা যায়। ফৌজিয়া খান তামান্না আপুকে অনেক ধন্যবাদ আয়শা'র মতো একটি বই আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। 🔹সম্পাদনা, বানান ও অন্যান্য : "আয়শা" বইটির প্রোডাকশন, বাইন্ডিং, প্রিন্টিংও অসাধারণ হয়েছে। পেইজের গুণগত মান, কালার, মার্জিন, লাইন স্পেস, ফ্রন্ট সাইজ, যতিচিহ্নের ব্যবহার ইত্যাদি সন্তোষজনক। বানান ভুলও খুব কমই নজরে এসেছে। তবে সম্পাদনায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। কিছু কিছু শব্দ একত্রিত হয়ে গেছে। তো আবার কিছু শব্দ ভেঙে গেছে। এই জিনিসটা আমি কয়েক জায়গায় লক্ষ্য করেছি। আশা করছি পরবর্তী এডিশনে ভুল ত্রুটি সংশোধন করে নেওয়া হবে। 🔹রেটিং : ৪.৫/৫






















