

Buy তিতুমীর : জান অথবা জমিন Online in Bangladesh
লেখক: আল আমিন সরল
- Author: আল আমিন সরল
- Publisher: শিরোনাম প্রকাশন
- Number Of Pages: 320
- Language: বাংলা
- Edition: 1st Published, 2025
পণ্য সারসংক্ষেপ (Summary)
যোদ্ধারা, মজলুমের কাণ্ডারীরা, অধিকার প্রত্যাশীরা, আজকে কোনো জয় পরাজয়ের হিসেব নেই, শুধুই যুদ্ধ। অধিকারের যুদ্ধ, হকের যুদ্ধ, জমিনের জন্য যুদ্ধ, মুক্ত বাতাসের জন্য যুদ্ধ, স্বাধীনতার যুদ্ধ, বাঁচা-মরার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। এই যুদ্ধ অনন্তকালের। জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে হারোনোর কিছু নেই আমাদের, শুধুই প্রাপ্তি। তাই যুদ্ধ করো শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত। হয়ে উঠো স্বাধীনতার রক্তবীজ।’ সারিবদ্ধ সৈন্যের সামনে ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে বললেন আমিরাত-ই-বাঙ্গালার রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর।
রিভিউ ও রেটিং (Review & Rating)

যদি পারতাম তাহলে বাংলার বিপ্লবীমনা সকলকে পড়তে বলতাম বইটি। পড়ার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে কি পড়তেছি এটা? কিছু জায়গায় পড়তে গিয়ে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল, লেখার অতল গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল নিজেকে। মাঝে মাঝে পড়া বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতাম কিছুক্ষণ। কখনও কখনও মনের অজান্তেই অশ্রুসিক্ত হয়েছে চোখের পাতা। কখনো কখনো শরীরের রক্ত টগবগ করছে বিপ্লবের ঘ্রাণে। কখনো কখনো নিজেকে খুঁজে পেয়েছি যুদ্ধের ময়দানে।
এভাবেও ইতিহাস লেখা যায় জানতাম না, অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে গেলো।
দ্যা কিং ইজ ব্যাক! 🔥 'তিতুমীর কেন পড়তে চাই?' এ লিখেছিলাম আফ্রিকার খঞ্জরের আল আমিন সরলকে সম্ভবত তিতুমীর দিয়ে ফিরে পাব। আফ্রিকার খঞ্জর পড়ে মুগ্ধ হওয়ার পর উনার লেখা ইন্দিরা গান্ধী ও কমলা রঙের আপেল পড়েছিলাম। সত্যি বলতে একটু গোলমেলেই লেগেছিল। তবে আশা ছিল তিনি ফিরবেন। আল আমিন সরল, ইজ দ্যা কিং অব হিস্টোরিক্যাল ফিকশন। এন্ড হি ইজ ব্যাক উইথ ব্যাঙ। ব্যাক উইথ মাস্টার ব্লাস্টার তিতুমীর। বৃহস্পতিবার সারাদিন ট্রেনিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে আর রাতের অর্ধেকটা মিলিয়ে গরম গরম পড়ে শেষ করলাম আল আমিন সরলের তিতুমীর: জান অথবা জমিন। এক কথায় যদি রিভিউ দিতে বলা হয়, তাহলে বলব মাস্টার ব্লাস্টার। ‘আমার প্রিয় মানুষেরা, আমার প্রিয় ভাইয়েরা, আমার প্রিয় বন্ধুরা, আপনারা শুনুন, আপনারা জানেন আমরা অন্যায়, অত্যাচার, অনাচার ও জলুমের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে একটি ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। যদিও সেটা খুব কম সময়ের জন্য। তবুও পেরেছিলাম, তাগুতের শক্তিকে হটিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে। অল্পদিনের জন্য হলেও পরাধীনতার শৃঙ্খল খুলে আমারা শ্বাস নিয়েছিলাম মুক্ত বাতাসে। আমাদের সবকিছু আমরা আমাদের করে পেয়েছিলাম। আপনারা দেখেছেন, আমাদের সামনে শত্রুরা সংখ্যায় বড়ো, অস্ত্রে-শস্ত্রে শক্তিশালী। কিন্তু মনে রাখবেন, তাদের আছে কামানের গোলা, বন্দুকের নল, অজেয় যুদ্ধ কৌশল; আর আমাদের শক্তিশালী ইমান, সাহস আর এই স্বাধীন মাটির জন্য বুকভরা ভালোবাসা। ভালোবাসার কাছে বারুদের আগুন নস্যি। তারা চায় আমাদের শাসন করতে, আমাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে, আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে─বিপরীতে আমরা শুধু একটা জিনিসই চাই : মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকার, কৃষক হিসেবে জমিনের অধিকার। মানুষেরা শুনুন, আপনারা যারা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তারা কেবল সৈনিক নন, কেবল সংস্কার আন্দোলনের অনুসারী নন, আপনারা আমার ভাই, আমার পরিবার। আমরা একে অপরের জন্য এই সংগ্রামে এসেছি। আমরা এক সাথে পায়ে পা মিলিয়ে পাড়ি দিয়েছি বহু পথ। প্রাণ দিয়েছি, অকাতরে ঢেলে দিয়েছি রক্ত। আমাদের রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এই জমিনের বুকে। আমি বিশ্বাস করি, আজও আমরা পিছপা হবো না, একজন আরেকজনকে ছেড়ে যাব না। আমরা মাথা নত করব না। বুক টান করে দাঁড়াব বন্দুকের নলের সামনে, কামানের গোলার সামনে। আমি শপথ করে বলছি, যুদ্ধ ময়দানে আপনারা আমাকেই সবার আগে পাবেন। আমাকে ভেদ না করে একটা কামানের গোলাও আপনাদের স্পর্শ করতে পারবে না।’ এমন একটা ভাষণ শোনার পর কার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটবে না? আমার ফুটেছে। মনে হয়েছে, এখনই ঝাঁপিয়ে পড়ি সংগ্রামে। ছিনিয়ে আনি স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। ‘ভাইয়েরা, আমাদের দেশের মাটি হিন্দু-মুসলিম উভয়ের জন্য সমান। আমরা একসাথে থাকি, একসাথে কাজ করি, একই জলে গলা ভেজাই, একই বাতাসে শ্বাস নেই, সূর্যের তাপে দগ্ধ হই, একই চাঁদের আলোয় দেখি প্রিয়তমার মুখ। আমরা এই মাটির সন্তান, এই মাটিতেই আমাদের একসাথে বাঁচতে হবে। হিন্দু-মুসলিম একে অপরের ভাই। কেউ আমাদের মাঝে কোনো ফাটল ধরাতে পারবে না। আমাদের পয়গম্বরে মোহাম্মদ মুস্তফা (সা.) তার বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন, কোনো মুসলমানের দ্বারা যেন কোনো অমুসলিমের ক্ষতি না হয়। নিজের ধর্ম পালন করতে গিয়ে অন্যের ধর্মকে যেন কটাক্ষ না করা হয়। তাই কেউ যদি আমাদের মধ্যে ফাটল ধরাতে চায়, বপন করতে চায় সাম্প্রদায়িকতার বীজ, আমরা সম্মিলিতভাবে তা রুখে দিবো। প্রয়োজনে জান দিয়ে দেবো, তবুও ভাই হয়ে ভাইয়ের জান নেবো না, করব না সামান্য পরিমাণ ক্ষতিও।' একজন নেতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কী? সবাইকে একত্র করা। আমরা ৫ আগস্টের পর যেই ইনক্লুসিভ বাংলাদেশের কথা বলছি, তিতুমীর সেই কথা বলেন গেছেন চারশো বছর আগেই। শুধু বলেই ক্ষান্ত হোননি। করে দেখিয়েছেন। এক বইয়ে পড়েছিলাম, তিতুমীরের আন্দোলন ছিল সত্যিকারের কৃষক আন্দোলন। এই আন্দোলনে প্রায় ৮৫ হাজার কৃষক অংশ নিয়েছিল। আল আমিন সরলের আফ্রিকার খঞ্জর পড়েছিলাম বইয়ের গ্রুপে রেন্ডম এক রিভিউ দেখে। অসাধারণ লেগেছিল। ঐতিহাসিক বয়ানে কীভাবে নিরপেক্ষ থেকেও মূল গল্প বলা যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আফ্রিকার খঞ্জর। সেই আশাতেই তিতুমীর পড়া৷ তিতুমীর পড়ে বলতেই হয়, আমার আশাভঙ্গ হয়নি। উল্টো মনে হয়েছে, লেখক এখন পপরিপূর্ণ। তার কলমের মাথা থেকে যা-ই বের হবে, তাই জেম টাইপের হবে। আফ্রিকার খঞ্জর ছিল ট্রেইলার। তিতুমীর পূর্ণাঙ্গ সিনেমা। দ্যা এবসুলেট সিনেমা। তিতুমীরের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে, তিতুমীরের কন্ঠে বলানো বিভিন্ন সময়ের ভাষণ। ভাষণ গুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, আমি তিতুমীরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি তার অভিব্যক্তি। তার প্রতিটি শব্দ চয়ন। হৃদয় নিংড়ে বের হওয়া প্রতিটি বাক্য। শুধু ভাষণগুলো এক মলাটে বন্দী করতে পারলেও দারুণ এক বই হয়ে যাবে। আরও একটা দিক হল যুদ্ধের বর্ণনা। এমন নিপুণ করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উপন্যাস জুড়ে, যেন সামনে থেকে দেখছি সব। চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে সব। আমার হাতের তলোয়ার। আমিই ঘোড়ার পিঠে। আমার তলোয়ারের আঘাতেই একে একে ধরাশায়ী হচ্ছে একটার পর একটা প্রতিপক্ষ সৈন্য। তিতুমীর নিয়ে আমার একটা ভয় ছিল। একটা বইয়ে পড়েছিলাম, তিতুমীর ভীষণ সাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। আমি দেখতে চেয়েছিলাম আল আমিন সরল এটাকে কীভাবে ডিল করেন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি সাম্প্রদায়িকতার যে অভিযোগ ছিল তা লেখক তার সুন্দর বর্ণনা ও মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়ে উৎরে গেছেন লেটার মার্ক পেয়েছে। অন্ততঃ আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। ঐতিহাসিক প্লটে লেখা উপন্যাসে যেমনটা হয়, তিতুমীরেও তাই হয়েছে। শুরুটা একটু স্লো। তবে অসাধারণ বর্ণনাশৈলীর কারণে তাল কেটে যাওয়ার মতো নয়। ক্যারেক্টার বিল্ডাপ করতে এই স্লোনেসের দরকার ছিল বলেও আমি মনে করি। মোদ্দাকথা তিতুমীর: জান অথবা জমিন বাংলা সাহিত্যে অমর সৃষ্টি হয়ে থাকবে। লেখকের ভাষ্যমতে, তিতুমীরকে নিয়ে এমন কাজ আর হয়নি কখনও। লেখকের কথা সত্যি। এমন কাজ আসলেই হয়নি। অন্ততঃ আমার চোখে পড়েনি। মেজর জানতেন, তিতুমীর শুধু কোনো ব্যক্তি-মানুষ নয়। সে হচ্ছে একটি আদর্শ। ব্যক্তি হত্যা করা যায়, কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করা যায় না। তবে জনসমক্ষে তার করুণ পরাজয় ও নির্মম মৃত্যু, সেই আদর্শকে মানুষের অন্তর থেকে ভুলিয়ে রাখে দীর্ঘকাল। কখনো সখনো শতাব্দিও পার হয়ে যায়। উপন্যাস- তিতুমীর: জান অথবা জমিন ঔপন্যাসিক- আল আমিন সরল প্রকাশনী- শিরোনাম প্রকাশন মুদ্রিত মুল্য- ৫৫০৳ পৃষ্ঠা- ৩২২ রেটিং: ৪.৯/৫ সতর্কতা: ধর্ম নিয়ে যাদের বাড়াবাড়ি আছে। তারা বিরুপ পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। বইয়ের ট্যাগ লাইন হিসেবে 'জান অথবা জমিন' পুরোপুরি সার্থক। পাঠক বইয়ের যত গভীরে যাবে ততই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে এর সার্থকতা।
মোটাদাগে তিতুমীরের জীবনি আমরা কমবেশী সবাই জানি। হাইস্কুলের ইতিহাস বইয়ে পড়েছি বাঁশের কেল্লার প্রতিষ্ঠা তিতুমীর কীভাবে ইংরেজ ও দেশীয় জমিদার জোতদারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। কীভাবে ঢাল তলোয়ার নিয়ে কামানের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। এইটুকু আমাদের প্রায় সবারই জানা। এর বাইরে তিতুমীর সম্পর্কে আমাদের বিশেষ করে আমার জানাশোনা একদমই কম। একেবারে নাই বললেও অত্যুক্তি হয় না। আল আমিন সরল যখন তিতুমীর লেখার ঘোষণা দিলেন, তখন ভেবেছিলাম কী আর লিখবে নতুন করে? ইতিহাসে কতটুকুই বা লেখা আছে তিতুমীরকে নিয়ে। লেখকের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রেই জানি, তিতুমীর সম্পর্কে এ অঞ্চলের ইতিহাসবিদরা যা কিছু লিখেছেন, তার বেশীর ভাগই ব্রিটিশ নথী থেকে পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে। আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, শত্রুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হিরোকে জাস্টিফাইড করা যাবে কিনা? লেখক উত্তরে বলেছিলেন, দেখা যাক না, কী হয়। পড়তে থাকি। এরপর লেখক সাহেবের সাথে বিভিন্ন সময় কথা বলেছি জেনেছি তিতুমীরকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই একের পর এক পড়ে চলছেন তিনি। আর নোট করছেন তার নীল মলাটের নোটবুকে। অবশেষে সব পরিশ্রম সার্থক করে এবার বইমেলায় প্রকাশ পেল তিতুমীর: জান অথবা জমিন। আমি তিতুমীর নিয়ে রিভিউ লিখবো না। বায়াসড হওয়ার সম্ভবনা আছে। কারণ তিতুমীর ও লেখক দু'জনেই আমার কাছে আবেগের চেয়েও বেশীকিছু। আমি শুধু তিতুমীর উপন্যাসে, তিতুমীরের স্ত্রী মায়মুনার চিঠি নিয়ে অল্প কথায় কিছু একটা লিখব। 'পত্রের শুরুতেই একটা বিষয় ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে, আপনার সেই অসীম সাহসিকতা কি আজও পাহাড়ের মতোই অবিচল আছে? কণ্ঠের সুললিতা, শীতল চোখের গভীর দৃষ্টি, বুকের ভেতর বয়ে চলা শান্ত নদী কি আগের মতোই আছে? নাকি আপনার কণ্ঠে এখন আগুন বর্ষণ হয়, শীতল ও গভীর চোখে জমা হয় টকটকে লাল রক্ত? নাকি বুকের শান্ত নদীতে উঠে উথাল-পাতাল ঝড়, ঝড়ের মধ্যে উঁকি দেয় দ্রোহ আর দ্রোহ? কেন এগুলো জিজ্ঞেস করছি জানেন? আমি কদিন থেকেই স্বপ্নে দেখি, আপনি বৈঠকখানার পাশে বড়ো আম গাছটার নিচে বাঁশের চরাটে বসে আছেন। আপনার কণ্ঠ থেকে কথার বদলে ঝরে পড়ছে আগুন। সমুদ্র-গভীর চোখ দুটো রক্ত লাল, যেন পুরো শরীরের সমস্ত রক্ত এসে দুই চোখে জমা হয়েছে। আপনার লোমশ বুকে মাথা রাখলে নাকে লাগে দ্রোহের ঘ্রাণ। এই ঘ্রাণ এতই মাদকতাপূর্ণ, আপনার কাছে ভালোবাসার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় আপনার গমগমে গলার সাথে গলা মিলিয়ে গর্জে উঠে বলি, ‘জান অথবা জমিন।’ এই পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর ও চির কল্যাণকর অর্ধের তার করিয়াছে, অর্ধেক তার নর। এই কথার বাস্তব প্রতিফলন চিঠির ঐ অংশটুকু। স্বামীর লোমশ বুকে মাথা রেখে যে নারী দ্রোহের ঘ্রাণ পায়, তার স্বামীর পক্ষে শুধু বাংলা কেন দুনিয়া জয় করে ফেলা সম্ভব। একজন নারী কতটা স্বাধীনচেতা ও স্বদেশপ্রাণ হলে স্বামীর কন্ঠে সুললিত প্রেমের কথা শোনার চেয়ে বজ্রকন্ঠ শোনার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করতে পারে। আমার মনে হয়েছে তিতুমীর তিতুমীর হয়ে উঠার পিছনে মায়মুনার অবদান সবচেয়ে বেশী। আমরা নারীরা জানি, স্বামীকে যদি বেঁধে রাখতে চাই৷ তাহলে দুনিয়ার কোন শক্তি নেই বাঁধন ছিঁড়ে তাকে মুক্তি দেয়। মায়মুনা মুক্ত করে দিয়েছিল বলেই তিতুমীর মুক্তি সংগ্রামের নায়ক হতে পেরেছিল। লেখক চিঠিটা এতো আবেগ আর যত্ন করে লিখেছেন যে মনে হয়, আমাদের দেখা অদেখা সকল বিপ্লবীর স্ত্রী অথবা প্রেমিকার হৃদয় মন্থন করে শব্দ খুঁজে খুঁজে সাজিয়েছেন চিঠির প্রতিটা বাক্য। 'বিপ্লবীর সহধর্মিণী হওয়া যে কতটা কঠিন, আপনি তা জানেন? প্রতিটি মুহূর্তে মনের সাথে সমঝোতা করে চলতে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বুঝি মৃত্যু সংবাদ এলো! এই বুঝি সংবাদ এলো বুকের উপর জখম নিয়ে পানি পানি বলে চিৎকার করে চলছেন আপনি! আবার পরক্ষণেই মনে হয়, না মৃত্যু আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না, তলোয়ারের ফলা আপনার দেহ পর্যন্ত আসবে না, আপনার বুকে এসে ভীষণ বেগে এসে আছড়ে পড়বে না কামানের গোলা। এসব শরীরে নেওয়ার জন্য জন্ম হয়নি আপনার! আপনার জন্মই হয়েছে কপালে বিজয় তিলক পরার জন্য, বলিষ্ঠ হাতে বিজয়ের পতাকা উড়ানোর জন্য, ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।' বিপ্লব একদিনে মহিরুহ হয় না। শুরু হয় ঘর থেকে। ঘর মানেই নিজের আপন নারী। আমি বিশ্বাস করি, কোন নারী যদি কোন পুরুষের কাঁধে হাত রেখে বলে, যাও আকাশ থেকে নামিয়ে আনো লাল সূর্য। পুরুষটি দ্বিতীয়বার ভাববে না। সূর্য নামিয়ে আনা সম্ভব কি সম্ভব নয়, ভাববে না। শুধু ভাবতে আমার কাছে আছে সাহসী এক হাত। সেই হাতের স্পর্শে যেমন আছে বলিষ্ঠতা, তেমনি আছে অসীম মায়া আর ভরসা। 'জওহর কেমন আছে? সে কি আপনার চেয়েও সাহসী? আপনার চেয়েও তেজোদ্দীপ্ত? যুদ্ধের ময়দানে সে কি আপনার ছায়ার নিচে থাকে, নাকি আপনি তার? যুদ্ধের ময়দানে পুত্র হয়ে পিতার আশ্রয়ে থাকাটা লজ্জার─আমি আমার পুত্রকে লজ্জায় দেখতে চাই না। আপনার হৃদয়ের ধনকে সেই লজ্জা আপনি দেবেন না, এই অনুরোধ।' একজন বীরে মা কেমন হয় আমি নিজ চোখে দেখেছি জুলাই আন্দোলনে। তিতুমীর পড়তে গিয়ে অনুভূতি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম। নিজের সন্তান দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আর তাকে লজ্জায় পড়তে দেখা যেকোনো মায়ের জন্যই লজ্জার। এই জায়গাটুকু পড়তে গিয়ে আমার গলা কেঁপে উঠেছে।।চোখের পাতা ভিজে গেছে। কতটা ত্যাগের বিনিময়ে আসে স্বাধীনতা। 'আপনার অপেক্ষায় থাকব। ফিরে আসুন, হয় গাজী নয়তো শহিদ; তবে স্বাধীনতা ছাড়া ফিরবেন না। আমার স্বামীর খালি হাত আমার সইবে না। ‘জান অথবা জমিন।’ প্রাণপ্রিয় স্বামীর চেয়েও যে স্বাধীনতার মূল্য বেশী তা মায়মুনার এই বাক্যে স্পষ্ট। লেখককে ধন্যবাদ আমাকে স্বাধীনতার মূল্য বোঝানোর জন্য। একজন নারীর দৃষ্টিতে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আমি মনে করি, শুধুমাত্র এই এক চিঠির জন্যই তিতুমীর সংগ্রহে থাকা উচিত। কাল্পনিক চিঠি যে এমন আলোড়ন তুলতে পারে হৃদয়জুড়ে, গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে শ্বাস-প্রশ্বাস আগে জানতাম না। এর পুরো কৃতিত্ব লেখকের। সবশেষে বলতে চাই, জানিনা তিতুমীর:জান অথবা জমিনের ভাগ্যে কি আছে। কতখানি পাঠকের মধ্যে আলোড়ন তুলতে পারবে। তবে যতটুকুই পারুক, তিতুমীরকে আমি বাংলা সাহিত্যের জীবনিভিত্তিক গ্রন্থে অনন্য সংযোজন হিসেবেই উল্লেখ করবো।























